Skip to content

শ্রী শ্রী জগৎজননীর মন্দির – মানিকতলা – কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

কলকাতা কে আমরা অনেকেই ‘কালীক্ষেত্র’ বলে থাকি, কারণ উত্তর থেকে দক্ষিণ, কলকাতার সমস্ত জুড়েই রয়েছে সহস্রাধিক কালী মন্দির। তবে উত্তরের এই কালী মন্দিরের ভিড়েও স্বমহিমায় অবস্থিত ‘জগৎজননী দুর্গা মন্দির’। এবছরের শারদীয়া সংখ্যা উপলক্ষ্যে কথাবৃক্ষের পক্ষ থেকে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম সেই মন্দিরের অন্যতম অধিকর্তা সঞ্জীব সাহার সঙ্গে কথা বলে মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে।

ভারতবর্ষে তখন ইংরেজদের শাসনকাল। অবিভক্ত ভারতে, মিরাটের এক ব্যবসায়ী জনার্দন সাহা ‘পান’- এর ব্যবসায় লাভ করে বিপুল সম্পদশালী হয়ে উঠলেন। ইংরেজ সৈনিকদের কাছ থেকে অর্জিত সোনাদানা-অর্থ সব কিছুই তিনি পাঠিয়ে দিতেন কলকাতায়, তার ভাই মুকুন্দর কাছে। কলকাতায় তাঁদের বসতবাড়ি ১২৬ নং মানিকতলা স্ট্রিটে। পরবর্তীকালে জনার্দন পাশেই আর একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেই সঙ্গে ১২৭৮ বঙ্গাব্দে ৭৭ নং মানিকতলা স্ট্রিটে পারিবারিক ‘জগৎজননী মন্দির’ নির্মাণ করেন। এই মন্দিরের বয়স প্রায় ১৫০ বছর।

বর্তমানে এই মন্দিরের যারা সেবায়েত তারা হলেন জনার্দন-মুকুন্দর পঞ্চম প্রজন্ম। তাদেরই মধ্যে অন্যতম প্রধান শ্রী সঞ্জীব সাহা আমাদের সঙ্গে কথোপকথন কালীন নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি মায়ের সম্পত্তির ‘রিসিভার’। তিনি মুকুন্দমুরারি সাহার তরফের রিসিভার। মধ্য কলকাতার তাদের এস্টেটের অধীনে এখনো বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে মায়ের সম্পত্তি রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমির পাশাপাশি, তাঁর অলংকারের সম্ভারও বেশ ভারী। এই সুবিশাল সম্পত্তি পরিচালনা করা হয় এস্টেটের পক্ষ থেকে। পরিবার মধ্যের মতান্তর যাতে আগামীদিনে কোনোভাবেই পুজোয় বাধা না হয়, এই ভাবনা থেকেই জনার্দন সাহা এই ব্যবস্থা করে যান। মায়ের পুজো, মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ, সবটাই হয় মায়ের নিজস্ব টাকায়। মন্দিরের পুরোহিত, কর্মচারী, এমনকী সাহা পরিবারের যারা সেবায়েত, অর্থাৎ জনার্দন-মুকুন্দর পরবর্তী প্রজন্মের খরচও মা নিজেই বহন করেন। সঞ্জীব বাবুর পাশাপাশি জনার্দন সাহার তরফের রিসিভার হিসেবে রয়েছেন সৌরেন সাহা। মায়ের সম্পত্তির পাশাপাশি নিজেস্বও সম্পত্তি ও প্রতিপত্যিও রয়েছে সাহা বাড়ির।

মানিকতলা স্ট্রিটের এই মন্দিরটি বাইরেথেকে হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন একখানা বসতবাড়ি। মন্দিরটির রং গোলাপি এবং সাথে সবুজ খড়খড়ি দেওয়া অনেকগুলি জানলা। মন্দিরের শ্রীদ্বার পেরিয়ে ঢুকলে বেশ কয়েকটি শ্বেত পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে উপর দিকে যা গিয়ে শেষ হয়েছে এক এক সুবিশাল হল-ঘরে। এই হল ঘরের বাঁ দিকের দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে গর্বগৃহ, যেখানে সপরিবারে অধিষ্ঠাত্রী দেবী জগৎজননী এবং বাকিটা অংশটি নাট মন্দির। এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হলো এর অভিনব মোজাইক টালির উপর নানা পৌরাণিক চিত্রের কারুকার্য, যেখানে রাস, দোল ও কালিয়াদমনের মত বিভিন্ন রঙিন চিত্র ফুটে উঠেছে।

এই মন্দিরের মাতৃমূর্তিটি অষ্টধাতু-নির্মিত হলেও, সোনার ভাগ রয়েছে বেশি। দেবীর গাত্রবর্নেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়। দেবীমূর্তির পিছনের চলচিত্রের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ময়ূরের পালকের আকৃতি এবং হাতে আঁকা পটচিত্র এই চলচিত্রের সৌন্দর্যকে এক আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। চলচিত্রের এই পটের মধ্যে রয়েছেন মহাদেব সহ বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্ররা। মাতৃমূর্তির পাশে অধিষ্ঠিত নারায়ণ শিলা। সাহা বাড়ির এই মন্দিরে, শারদীয়া দুর্গাপুজোর বিশেষ কোনো প্রচলন নেই। পারিবারিক নিয়ম মেনে চৈত্র মাসে ‘বাসন্তী পুজো’ হয় প্রতি বছর। মাঘী পূর্ণিমার পরের সংক্রান্তিতে পালিত হয় ‘জগৎজননীর জন্মযাত্রা’ যা আক্ষরিক অর্থে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসও বটে। এই দুটি বাৎসরিক উৎসবের পাশাপাশি নারায়ণ আছেন বলে দোলযাত্রা, রাস, ঝুলন ইত্যাদি উৎসবও সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়।

বাসন্তী পুজোর চার দিন অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে দশমী মা সাজেন রাজবেশে। তাঁর অঙ্গরাগ ও অঙ্গসজ্জায় লেগে যায় অনেক সময়। এই সমস্ত কিছুর দায়িত্বে থাকুন এখানকার কুলপুরোহিত। এই মন্দিরের পুরোহিত থেকে আরম্ভ করে ঢাকি-ঢুলি প্রত্যেকেই বংশপরম্পরায় নিযুক্ত রয়েছেন মায়ের সেবার কাজে। ষষ্ঠীর দিন রয়েছে মায়ের অধিবাস ও বোধনের রীতি। সপ্তমীর দিন দেবীমূর্তির পাশে স্থাপিত হয় নবপত্রিকা। অষ্টমীর দিন ধুনো পোড়ানোর রীতিও আছে এই বাড়িতে। আর সন্ধারতির পর হয় ‘চাঁচড়’ পোড়ানো – খড়ের রাবণ তৈরি করে তাতে আগুন দেওয়া হয়, যেমনটা করা হয় দোলের আগের দিন। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে পালিত হয় সন্ধিপূজো। এইবাড়ির সন্ধিপূজো এক দর্শনীয় ব্যাপার। দশমীর দিন নবপত্রিকা বিসর্জনের মাধ্যমেই পুজো সুসম্পন্ন হয়। সাহা বাড়িতে দেবী পূজিতা হন মাতৃরূপে, তবে এই নবপত্রিকা বিসর্জনের সময় রয়েছে কনকাঞ্জলির নিয়ম। বাড়ির সধবারা দেবীকে বরণ করেন, সিঁদুর খেলেন।

এই বাসন্তী পুজোর সময় সাহা বাড়ির ‘ধন-লক্ষ্মী’-দের নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীমন্দিরে। পুজোর চারদিন মোট ছয়টি লক্ষ্মীর স্থান হয় নারায়ণ শিলার পাশে, দেবীর কাছে। ব্রাহ্মণ পরিবার না হওয়ায় অন্নভোগের রীতি নেই এই পরিবারের। তাছাড়া রান্না করে ভোগ দেওয়ারও প্রচলন নেই। বিশেষত শুকনো ভোগই নিবেদন করা হয় জগৎজননী কে। ভোগের আয়োজনে থাকে নানা রকমের মিষ্টি, ক্ষীর ও ফল। তবে রসের মিষ্টি দেওয়া হয় না মাকে, সাধারণত থাকে সন্দেশ জাতীয় মিষ্টান্ন। বলি প্রথা এই পরিবারে নেই।

পারিবারিক আন্তরিকতা ও সঞ্জীব বাবুর কথাবার্তায় আমরা মুগ্ধ হয়েছি, এক মনে শুনে গেছি তাঁর পারিবারিক ইতিহাস ও মন্দিরের কথা। কালের গতিতে অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে, রাজা না থাকলেও থেকে গিয়েছে রাজত্ব, বংশ পরম্পরায় থেকে গিয়েছে ঐতিহ্যের সম্ভার। মানিকতলার এই জগৎজননী মন্দিরের অর্থাৎ সাহা বাড়ির বর্তমান সদস্যরা সেই ঐতিহ্য, সাবেক রীতি এবং আচার অনুষ্ঠান নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।

Copyright © Kothabriksha 2021, All Rights Reserved.

দত্ত বাড়ির অভয়া দুর্গা – পাহাড়হাটি, বর্ধমান – কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

শ্রী শ্রী জগৎজননীর মন্দির – মানিকতলা – কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

সোনার দুর্গা মন্দির – বেহালা | কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

মানিকতলা ঘোষ বাড়ির দুর্গোৎসব – কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা, ২০২১

|| শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির – কুমারটুলী || কথাবৃক্ষ শারদীয়া সংখ্যা – ২০২১

Ambika Ghosh benaras Bengal Bengali Literature Bengali Poetry bengali short story coronavirus Dakshinee dreams Durga Puja Editorial Emotions folk culture India indian politics Kashmir Kobita kolkata kothabriksha lockdown Music Nature nilimesh ray poem Poetry Pratyay Pratyay Raha pritam chowdhury Rabindranath Rabindranath Tagore Rabindrasangeet Religion sharodiya shonkhya shortstory society Srabanti Sen Stories Story Sustainable Travel Suvo Guha Thakurta Theatre travel Travelogue west bengal World Environment Day

Published inKothabriksha Sharodiya Edition 2021

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: