Skip to content

হে মৌনী তাপস

‘আইল নতুন বছর লইয়া নব সাজ,
কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’

পারেন বটে কবিগুরু। এই দুঃসহ গ্রীষ্মে, খটখটে শুষ্কতার মধ্যেও উনি কাব্যিক রসের সন্ধান পেয়েছিলেন। আর আপামর বাঙ্গালী যার ফলে হন্যে হয়ে বৈশাখ মাস আসার আগে থেকেই, ঘেমে, নেয়ে একসা হয়ে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ বলে গলা শুকিয়ে ফেলছে প্রতি বছর। কোথায়, সুন্দর ঠান্ডা আবহাওয়ার পৌষ বা অগ্রহায়ণ মাসকে তো কেউ এরকম সাগ্রহে ডাকে না! তবে গরমকাল হলেও পয়লা বৈশাখ নিয়ে আসে নববর্ষের সূচনা। সাথে নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা, নতুন পোশাক আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। এই প্রাপ্তিগুলি অস্বীকার করি কি করে! অগত্যা, মহতী মনস্কের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে বৈশাখের এক অন্য রূপ দেখতে সঙ্কল্পিত হওয়া গেল।

ভারতবর্ষে, বৈশাখ মাস গ্রীষ্মের আনুষ্ঠানিক সূচনাকাল ধরে নেওয়া হয়। স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী বৈশাখ হল ধর্ম, যজ্ঞ, ক্রিয়া ও তপস্যার মাস। এই মাস ভগবান বিষ্ণুর উপাসনার মাসও বটে। কথিত আছে, বৈশাখী পূর্ণিমায় পবিত্র নদীর জলে স্নান করে তিল ও মধু উৎসর্গ করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি গৌতম বুদ্ধের জন্ম তিথিও বটে।

এছাড়াও বৈশাখে শুরু হয় নতুন বছর। শুধু বাংলায় নয়, ভারতের অনেক প্রদেশেই আঞ্চলিক বর্ষবরণ উদযাপিত হয় এই সময়। বৈশাখ মাসেই নববর্ষ উদযাপন হয় পাঞ্জাব, হরিয়ানায়। বৈশাখী উৎসব। বসন্তের শেষ, ফসল কাটার আনন্দের সাথে ‘খালসা’র প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবেও পালিত হয় এই দিনটি। লোকসঙ্গীত, ভাঙরা নাচ, উজ্জ্বল রঙের ঝলমলে নতুন পোশাক- সব মিলিয়ে মেলা বসে যায় আর মেলায় নানাবিধ সুস্বাদু খাওয়াদাওয়া ও হইহুল্লোড়ে পরিবার, পরিজন, আত্মীয়, বন্ধু মিলে মেতে ওঠে সবাই।

ছবি: Google

আসামে এই সময় হয় বোহাগ বা রঙ্গালি বিহু। এও ফসল ঘরে তোলার উৎসব যার সাথে মেশে অসমিয়া নববর্ষ। রঙ্গালি অর্থ রঙ্গীন। বিহু নাচের তালে তালে জমে ওঠে উৎসব।

বাংলা নববর্ষের দিনে পয়লা বৈশাখেই হয় ত্রিপুরার বছর শুরু। কোনও কোনও প্রান্তে এর নাম বুইসু। বাড়ির পুরনো জিনিস, বাসন-পত্র বাতিল করে নতুন জিনিসে ঘর সাজানো হয় এই উপলক্ষ্যে, পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয় জল ও সুস্বাদু সব খাবার, সবাই মিলে পরিবারের সাথে পালন করা হয় এই দিনটি।

উড়িষ্যারও নতুন বছর হয় পয়লা বৈশাখেই, এর নাম পানা সংক্রান্তি। আম, নারকেল, দুধ, দই দিয়ে তৈরি একটি শরবত বা পানা খাওয়া হয় এই বিশেষ দিনে যার থেকেই সম্ভবত এই নামকরণ। উড়িষ্যাবাসী এদিন শিব, সূর্য ও হনুমানজীর পূজা করে থাকে। প্রার্থনা ও জীর্ণ পুরাতনের বিদায়ের মধ্যে দিয়েই হয় পুথান্ডু, তামিলনাডুর বর্ষবরণ, তারিখ সেই পয়লা বৈশাখ, তামিল মাসের নাম চিথিরাই। অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে, ঐতিহ্য বজায় রেখে পালিত হয় মণিপুরের সাজিবু চেরাওবা, তাদের নতুন বছরের সূচনা হিসেবে, যদিও তারিখ বা তিথি সবসময় বৈশাখ মাসের হিসাবে হয় তা নয়, এটি নির্ণয় হয় চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী।

ফিরে আসি বাংলা নববর্ষে। প্রতিটি জাতি ও সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভূতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। তাই কথায় আছে বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর এই পার্বণের প্রথম পার্বণ হলো বাংলার নববর্ষ। এই নববর্ষ বাঙালীর খুব কাছের এবং আত্মার একটি উৎসব। বৈশাখ মাসের হাত ধরে বাঙালীর নতুন যাত্রা শুরু। এ বিষয় বলে রাখি, বাংলায় আমরা মাসগুলোর যে নাম ব্যবহার করি তা এসেছে মূলত জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে। বাংলা মাসগুলির ক্ষেত্রে যে নক্ষত্র, মণ্ডলে ঢোকার পর পূর্ণচন্দ্র দেখায় সেই নক্ষত্রের নামেই ওই মাসের নাম রাখা হয়েছে। যেমন বৈশাখ – এর নামকরণ হয়েছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকে।

আমাদের এই নববর্ষের সঙ্গে মিশে আছে হাজার বছরের কৃষি সংস্কৃতি। বঙ্গভূমি কৃষিকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ ভূখণ্ডের অংশ, যার জীবনপ্রণালি কৃষি সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল। সেই কারণেই ফসল যখন নতুন থাকে, তখনকার সূর্য এবং চন্দ্রের অবস্থান কে ভিত্তি করেই পৃথিবীতে নববর্ষ পালনের সূচনা হয়। সম্রাট অশোকের সময়কাল থেকে এই পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ এর শুরু। সেই সময় বাদশাহী রাজস্ব এবং তহসিল বিষয়ক হিসেব নিকেশ করা হতো হিজরির দিন সন অনুযায়ী।  মুসলিম ঐতিহ্যের হিজরি সনকে ভিত্তি করেই সম্রাট আকবর, বাংলার কৃষকদের সুবিধার্থে হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

বাঙালীর নববর্ষ মানেই হালখাতা আর লক্ষী-গণেশের পুজো। এই হালখাতা প্রকৃতপক্ষে বাংলা বছরের প্রথম দিন, পুরোনো দেনা – পাওনার হিসেব মিটিয়ে দোকানপাটের নতুন হিসেব নিকেশ শুরু করা হয়। এছাড়াও বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ঋতুর নিজস্ব প্রভাব রয়েছে। চৈত্রের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন চারিদিক অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখন বৈশাখের প্রথম সূর্যদয়ের প্রথম আভা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে এ এক নতুন সূচনা, প্রাণে জাগিয়ে তোলে নব আনন্দ। কৃষকেরা নতুন করে বাঁচার আশা খুঁজে পায়, পুরনো বছরের ব্যর্থতাগুলো ঝেড়ে ফেলে নতুন দিনের প্রত্যাশায় কৃষক ফিরে তাকায় দিগন্তের মাঠে।

ছবি: Google

বৈশাখ যেমন আমাদের জন্য নতুন আবাহনের সৌরভ নিয়ে আসে তেমনই সাথে আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে কালবৈশাখীকে। কালবৈশাখীর বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুতে পাক ধরে, গরমে অস্থির হয়ে ওঠা মানুষের শরীরে ঠান্ডা বৃষ্টির ফোঁটা আরামের পরশ এনে দেয়। এছাড়াও গ্রামবাংলায় গোটা বৈশাখ মাস ধরে চলতে থাকে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মেলা, পার্বন, উৎসব। তাইতো এই বৈশাখকে আমাদের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা করেছেন মৌনী তাপস হিসেবে এবং বলেছেন :

জীর্ণ যা-কিছু যাহা-কিছু ক্ষীণ
নবীনের মাঝে হোক তা বিলীন–
ধুয়ে যাক যত পুরানো মলিন
নব-আলোকের স্নানে॥

আশা করি এই নববর্ষ সকলের জীবনে নতুন কিছু বয়ে নিয়ে আসুক। আগামী দিনে করোনা পরিস্থিতির জেরে যে ঝড় আমাদের ওপর আসতে চলেছে তার বিরুদ্ধে যেন আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে পারি। তবে এই একসাথে হওয়া মানে কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখা, মনে মনে একে অপরের পাশে থাকা, সাথে থাকা, সুরক্ষাবিধি মেনে চলা। ভালো থাকুন সকলে, সুস্থ থাকুন।

অন্যান্য ছবি : শুভ্রদীপ

Copyright © Kothabriksha 2021, All Rights Reserved.

Published inEditorial

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: