Skip to content

Reviving Indian Folk Arts 2020: Report

Last updated on March 14, 2021

গত বছর নভেম্বর মাসে আমরা কথাবৃক্ষের পক্ষ থেকে RIFA (Reviving Indian Folk Arts) প্রোজেক্টটির পরিকল্পনা করেছিলাম। এই প্রোজেক্টটির মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতবর্ষের বিভিন্ন লোকশিল্প এবং লোকশিল্পীদের নিয়ে কাজ করা। প্রতিটি জাতির গোষ্ঠী চরিত্র বহনকারী যে সমাজ থাকে, তারা তাদের বুদ্ধিমত্তা, নান্দনিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক বোধ দিয়ে লোক ও কারুশিল্প সৃষ্টি করে৷ দেশের এই ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি আজকের দিনে বহু জায়গায় ধুঁকছে। তার কিছুটা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং কিছুটা প্রযুক্তির কারণেই। তাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য সেই সমস্ত লোকশিল্পীদের আমাদের সাধ্য মতন সাহায্য করা।

২০২০ সালের নভেম্বরে, পরিকল্পনার পর, ডিসেম্বর মাসে আমাদের প্রথম যে কাজটি হয় তা ছিল পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্পের ওপর ভিত্তি করে।আমরা পুরুলিয়া জেলার চড়িদা গ্রামের ছৌ মুখোশ শিল্পীদের এবং ছৌ নৃত্য শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছি।

চড়িদা-র মুখোশ-শিল্পী

গত বছরের করোনা আবহে ছৌ মুখোশ শিল্পীদের অর্থনৈতিক অবস্থা অতি সঙ্গীন হয়ে পড়ে। তাদের অল্প বিস্তর সঞ্চয় যা ছিল তা লকডাউনেই শেষ হয়ে যায়, এবং কালানুক্রমে পরিস্থিতির আরো খারাপ হতে থাকে। এদিকে ছৌ নৃত্য শিল্পী এবং যন্ত্র শিল্পীদের কোনো অনুষ্ঠান না থাকায় তারা মুখোশের অর্ডার দিতে পারে না। তাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল চড়িদার মুখোশ শিল্পীদের থেকে মুখোশ কিনে তাদেরকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করা এবং সেই মুখোশ নৃত্য শিল্পীদের হাতে তুলে দিয়ে তৎকালীন পরিস্থিতির নিরিখে তাদের পাশে দাঁড়ানো যাতে তারপর তারা অনুষ্ঠান করে তাদের জীবনে একটা স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারে এবং তারা ফিরলেই ছৌ মুখোশ শিল্পীরা ফিরবে, কারণ এর একে অপরের পরিপূরক।

সেই ভাবনা থেকেই আমরা পৌঁছে যাই চড়িদা-র অদূরেই অবস্থিত মাদলা গ্রামে, যেখানে  ছৌ নৃত্যশিল্পীদের বেশ কিছু পরিবার বাস করেন, এবং যারা এই করোনা-আবহে একইভাবে আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন। আমরা চড়িদা থেকে কেনা কিছু মুখোশ তাঁদের হাতে তুলে দিই তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী।

মাদলা-য় নৃত্যশিল্পীদের হাতে মুখোশ তুলে দেওয়া হল

এরপর আসি ‘সিদো কাহ্নু মিশন’-এর কথায়। এই মিশনটিতে পুরুলিয়া জেলার ‘আড়ষা’ ব্লকের ‘ভালিডুংরী’ নামক একটি আদিবাসী গ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি থেকে বহু ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। সেখানে তারা নানা রকম হাতের কাজ শেখে।

সিদো কাহ্নু মিশন – এ পড়ুয়ারা

২০১২ থেকে ‘১৪ সালের মধ্যে এই মিশনটি প্রতিষ্ঠা করেন  নরেন হাঁসদা, নামক এক ব্যক্তি। ব্যক্তিগত জীবিকায় তিনি একজন সাঁওতালি লোকগানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। বহু প্রতিকূলতা কে জয় করে তিনি পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের এক প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তুলেছেন। এই আশ্রম বা মিশনটিতে এমন বহু মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন, সমাজের মূল স্রোত যাদেরকে কোন স্থান দেয় নি। মিশনটিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডিতেই আবদ্ধ রাখা হয়নি। তারা সেখানে পায় পরিবেশ সচেতনতার পাঠও। সেই সঙ্গে তারা তাদের নিজেদের সংস্কৃতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যা প্রায় লক্ষ্যই করা যায় না। সেখানকার  ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শেখানো হয় যে, আধুনিকতা যেভাবে পৃথিবীর সবুজকে গ্রাস করে নিচ্ছে; এর পরিণতিতে একদিন সেই আধুনিক মানুষ কে অক্সিজেনের বোতল সঙ্গে করে ঘুরতে হবে – আজ যেমন সে জলের বোতল নিয়ে ঘোরে।

সেখানে আমরা কথা বলেছিলাম নরেন বাবুর সঙ্গে, শুনেছিলাম তার গান। সেই গানের সুর আর ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল লাল মাটির গন্ধ আর পলাশ রাঙা দিগন্তের স্বপ্ন। যে স্বপ্ন নরেন বাবু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও রোপণ করতে চান। যে স্বপ্নে, মানুষ স্বপ্ন দেখে এক সুস্থ সচেতন সমাজ গড়ে তোলার। আশ্রমটাতে যাওয়ার পর থেকেই তাই বারবার মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’এর কথা। মনে হচ্ছিল, হ্যাঁ! এমনই এক স্বদেশী সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন আমাদের দার্শনিক কবি।! ২৬ ডিসেম্বর,২০২০ তারিখটা এই কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে   যে, আমরা তাদের কতটা সাহায্য করে এসেছি বলে নয় – বরং আমরা তাদের কাছ থেকে স্বপ্ন দেখা শিখে এসেছি বলে।

RIFA -র তরফে কিছু সাহায্য তুলে দেওয়া হয় নরেনবাবুদের

এইভাবে আমাদের RIFA-র প্রথম পথ চলার শুরু। পুরুলিয়ার তিনটি ক্ষেত্রে আমরা পৌঁছে দিতে পেরেছি আমাদের বন্ধুত্বের হাত। তাদের কতটা সাহায্য করতে পেরেছি, তা জানি না। তবে নিজেরা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। কারণ আমরা কলকাতায় বসে নানা লোকশিল্প দিয়ে ঘর সাজাই, লোকগান শুনি ঠাণ্ডা ঘরে বসে। বাউল গানের দেহতত্ত্ব নিয়ে চর্চা করি ভরপেট খেয়ে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, আমরা কি তাদের সেই সাধনার কাছে পৌঁছাতে পারি? তারা এমএ, বিএ পাশ করে না, ডক্টরেটের স্টিকার লাগিয়ে বাগ্মিতা করে না  – তারা লোকজীবন-চর্যা করে। আর আমরা কেবলমাত্র শুকনো চর্চাতেই নিজেদের কলার তুলি। সেই কারণেই RIFA নামক এই সংগঠনটি গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম আমরা। খুব স্বল্প পরিসরে আমাদের প্রয়াস বাস্তবায়িত হয়েছে। আগামীতে এইভাবেই আমরা ধাপে ধাপে প্রথমে এই বাংলার বিভিন্ন লোকশিল্পী দের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাই, তারপর ভবিষ্যতে একইভাবে এই ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের লোকশিল্পীদের কাছে পৌঁছে যেতে চাই, যুক্ত হতে চাই তাদের সাধনার সঙ্গে। সেই কারণে আগামীতেও আপনাদের সকলকে আমাদের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ লোকসংস্কৃতিই এই মানবসভ্যতার আকর – শিকড়কে যদি আমরা ভুলে যাই তবে আধুনিকতা যতই ফল ফলাক না কেন তা শেষ পর্যন্ত অন্তঃসারশূন্য পরিণতিতেই পর্যবসিত হবে। তাই আসুন জীবনকে মাটির কাছাকাছি… ঘাস এর কাছাকাছি… জলের কাছাকাছি নিয়ে যায় যেখানে, শিল্প আর জীবন আলাদা কিছু নয়…যেখানে জীবনটাই শিল্পের কথা বলে, আর শিল্প দিয়েই জীবন রচিত হয়ে চলে – অনায়াসে, অক্লেশে।

এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং তার সফল রুপায়ন কখনোই সম্ভব হত না, যদি কথাবৃক্ষের শুভাকাঙ্ক্ষীরা কথাবৃক্ষের পাশে না দাঁড়াতেন। আমরা তাই এই কাজের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত সকলকে কথাবৃক্ষের সম্পাদকীয় বিভাগের তরফে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই। আশা রাখব, ভবিষ্যতেও একই ভাবে আমরা আপনাদের পাশে পাবো।  

ছবি: শুভ্রদীপ ব্রহ্ম ও প্রীতম চৌধুরী

Copyright © Kothabriksha 2021, All Rights Reserved.

Published inEditorial

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: