Skip to content

কালী দাশগুপ্ত স্মরণে – প্রত্যয় | শারদীয়া সংখ্যা

“ভারতবর্ষে অন্তত পাঁচশো ডায়ালেক্ট আছে। বহু বিচিত্র ভারতবাসীর সংস্কৃতি, তাঁদের সামাজিক – অর্থনৈতিক অবস্থা। অনেক জায়গায় প্রাক সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাও চালু আছে। এঁদের যে সংস্কৃতি তা অতি অবশ্যই সামন্ততান্ত্রিক। কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক সমাজে কি দ্বন্দ্ব নেই? সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির সমস্তটাই কি শুধু মেনে নেওয়া, শুধুই বিশ্বাস, শুধুই ধর্ম? না তার নানান রূপ আছে, নানান প্রকার আছে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে শোষিত শ্রেণি বুঝি শোষণ সহ্য করে নেয়, মেনে নেয়। কিন্তু এটা বাইরের চেহারা। ভেতরে ভেতরে প্রতিবাদের আগুন জ্বলতেই থাকে।”

– কালী দাশগুপ্ত

দিগন্ত বিস্তৃত আলোর মতো যেই মানুষটি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, আজ আমরা তাঁর গল্প বলবো, তাঁর নিজের লেখা থেকে কিছু কিছু কথা শুনবো, আমাদের কথার সাথে একই ভাবনায় মেলে ধরার চেষ্টাও করবো, আর তাঁর গানের সংগ্রহ নিয়ে তো অবশ্যই কথা হবে। সময় কে রুখে দেওয়ার যুগপুরুষ ও লোকসমাজ কে তার মূল থেকে বুঝে, বিশ্লেষণ ও বিবেচনা করে এবং মানুষের মধ্যে থেকে, তাদের সংস্কৃতি কে ভেতরে গ্রহণ করে তারপর একটা নতুন বৈচিত্রময় পৃথিবী তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কালী দাশগুপ্ত।

বলাই বাহুল্য এই সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থান বুঝতে হলে একটা নির্দিষ্ট ও শক্তিশালী মার্কার (Marker) প্রয়োজন, বা সেই অবস্থানের পরিবর্তন বুঝতে গেলেও সেই একই মার্কার আমাদের সাহায্য করতে পারে। লোকসমাজের ক্ষেত্রে অনেক মার্কারের মধ্যে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মার্কার হলো লোকসংগীত। আর ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই লোকসংগীত সংগ্রহের কাজে যদি কয়েক জন মানুষের নাম থাকে, তাহলে তার মধ্যে শ্রী কালী দাশগুপ্ত চিরকাল অন্যতম হয়ে থাকবেন।

একবার ওনাকে লোকসংগীতের সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এবং এও জানতে চাওয়া হয়েছিল যে লোকসংগীতের শুরু কোথায়, তার উত্তরে কালী দাশগুপ্ত বলেছিলেন, “দেখুন, আমি পন্ডিত লোক নই অতটা, ওই ভাবে উৎস নিয়ে কিছু ভেবেছি তাও নয়। তবে কিছু গান সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছি লোকসংগীতের মধ্যে যে দুই-সুর, তিন-সুর, চার-সুর, আস্তে আস্তে সুরের, স্বরের সংযোগ বাড়ে, এই সবই তার চারপাশের সাধারণ আটপৌরে জীবনের প্রতিফলন, তার থেকেই তার কথা জীবনকে ব্যক্ত করেছে। সুর তাতে অন্য ধরনের একটা রূপ দিয়েছে। কাজেই এটা ঠিক যে, শুধু লোকসংগীত নয়, সংগীতের উৎসই বোধ হয় লোকজীবন। সেই জীবন থেকে তার ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, ছোট ছোট প্রয়োজন, ছোট ছোট চিত্র দেখা, সেই সব কিছুই এই গানের মধ্যে আমরা পেয়ে থাকি।”

লোকসংস্কৃতি বা লোকসংগীত কে সেই ভাবে সংজ্ঞায়িত করা বোধ হয় সম্ভব নয় কারণ পুরো প্রক্রিয়া টা খুব গতিশীল, পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নতুন নতুন রাস্তা খুঁজে নিজেকে বদলাতে থাকে। সংগীতজ্ঞ ও মডার্ন অর্গানোলজির প্রবক্তা (বাদ্য যন্ত্র নিয়ে কাজ ও গবেষণা) কার্ট স্যাক্স বলেছেন, “The question of origin cannot be solved. The beginnings of music are lost in the days of yore, as are the rudiments of speech, religion, and the dance. All we can achieve is to follow these manifestations back to the time when the curtain slowly rose over the earliest act of mankind’s history”, আবার এও সত্যি সব সংস্কৃতি নিজের মতো করে স্বতন্ত্র, তাই ঘানার লোকসংস্কৃতি আর গোয়ালপাড়িয়ার লোকসংস্কৃতি এক ধাঁচে ফেলে সংজ্ঞায়িত করা টা ঠিক হবেনা। এথনোমিউজিকলজিস্ট ফিলিপ বোলম্যান তাঁর বই ‘The study of folk music in the modern world’ এ বলেছেন, ‘The search for the sources of folk music has produced anything but unequivocal results. One can safely say that there are as many concepts of the origins of folk music as there are theories of folk music; few of the field’s basic issues remain untouched. A survey of these concepts, therefore, is a historiographic approximation of the entire field’, তাই দেখার চোখ আর ভাবনার জগৎ টাকে অনেক বড় করতে করতে এগোতে হবে। কালী বাবুর নিজের সংগ্রহের মধ্যেই যদি দেখি, পূর্ব ভারতের (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম) ও বাংলাদেশের এত ধরণের গান আর গল্প রয়েছে (ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, চটকা, বাউল, গোয়ালপাড়ার গান, মাহুতের গান, আরো অনেক বিবিধ ফর্ম) এবং প্রত্যেক টা ফর্মের ইতিহাস এত বিবিধ ও বিচিত্র রূপ নিয়েছে তা এক ছাতার তলায় আনা অসম্ভব। বোলম্যান আরো বলেছেন, ‘The effect of surveying concepts of origin has the further result of revealing a vast range of musical activities acknowledged as folk music, and that, of course, fits well with my intent to cast off many of the restrictive shackles clamped on folk music.’, এর সাথে উনি যোগ করেছেন যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘there is a need to expand the theoretical tolerance of folk music in the modern world’।

মানুষের সব চেয়ে বড় অভিশাপের কথা বলতে গিয়ে কালী দাশগুপ্ত বলেছেন, “We live socially, but we think individually”, এই কথাটা ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি একটি অপূর্ব উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, “বহু লোকের কাজের ফলে একটা খাট তৈরি হয়। সেই কাঠ কোন জঙ্গলে ছিল, গাছ কে কেটেছিল, সেই তক্তা কীভাবে এসেছিল, তারপর কারা তৈরি করেছিল এই খাট এসব আমরা ভাবিনা। আজকে এই খাটে আমি শুই এবং মনে করি আমার খাট।”

গানের আলোচনা ও সংগ্রহের কথায় আসি। এই সব গানের মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক বিষয় উঠে এসেছে এবং সঠিক ভাবে দেখলে এই গানের ভেতর দিয়ে লোকসমাজের ছবি প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায়। যেমন ‘ওকি ও মোর ভাবের দ্যাওরা’ গানটিতে একটি লাইন আছে,

“বাপো ভাই মোর দুরাচার ব্যাচে খাইচে মোক দূরান্তরেরে, ব্যাচে খাইচে মোক মদকিয়ার ঘরেরে,

মদকিয়া মদ খায় পানি দিয়ে মোর রাতি পোয়ায়রে,
নাটির ডাঙ্গে শরীল কইলো মোর কালা রে”

অর্থাৎ একটি মেয়ে দ্যাওর কে দুঃখের কথা জানাচ্ছে, এইখানে সামন্ততান্ত্রিক পুরুষ কর্তৃত্ব (feudalistic male dominance), উল্টো পণ প্রথা (reverse dowry, where parents of the bride used to get money for selling their daughters for marriage), বাল্যবিবাহ (child marriage) এই গানে উঠে এসেছে।

কালী বাবুর সংগ্রহে পাওয়া যায়, পরের দুটো লাইন যেখানে মাতালের কথা বলা হয়েছে, সেটা পাঠান্তরে গঞ্জরুয়ার কথা বলে,

“ব্যাচে খাইচে মোক গঞ্জরুয়ার ঘরে,
গঞ্জরুয়া গাঞ্জা খায়, আগুন দিতে মোর রাত পোয়ায়রে”

এই উল্টোপণ প্রথা চালু ছিল কারণ মেয়েদের কে সন্তান ধারণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো, বাংলা আসাম এর বিভিন্ন জায়গায় এই ফার্টিলিটি কাল্ট তৈরি হয়ে গেছিল, তাই সন্তান ধারণ আর ফসল ফলানোর পদ্ধতি কে একই সঙ্গে ব্যক্ত করা হতো, সংগ্রহের থেকে গানও পাওয়া যায়,

“তীর পড়ে ঝাঁকে রে ঝাঁকে বাদল পড়ে রয়্যা
কুত্তি গেইলু মারেয়ার মাইয়া তীর কুড়াও আসিয়া রে”

এ হলো বাদুড় তাড়ানোর গান, যাতে ফসল না খেয়ে যায়, বাদুড় তাড়ানোর অনুষ্ঠানও হতো, যারা আয়োজন করতো তাদের বলা হতো ‘মারেয়া’, এবং এই গানে বাদুড় রূপান্তরিত হয় প্রেমিকে।

দ্যাওরের সাথে বন্ধুত্বের, প্রেমের গানও অনেক আছে, কালী বাবু লিখছেন, “দেওরকে বা অন্য প্রেমিক কে ভালোবেসে সে তার অবরুদ্ধ নারীত্বকে (caged femininity) মুক্তি দেবার চেষ্টা করেছে, এটাকে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত বৈধ মূল্যবোধ দিয়ে বিচার করলে মারাত্মক ভুল হবে”।

প্রেমিক বা বন্ধুর কথা অনেক গানে উঠে এসেছে,

“পার হয়্যা যাইম বন্ধুক দেখিবারে,
না দ্যাখং বন্ধুর মুখ, মনে মোর নাইরে সুখ,
না শোনং আর কাজেলারে বন্ধুর গান,
যে জন করিবে পার, তাকে দিম মুই গলার হার,
পার হইলে যৌবনরে দিম দান”

প্রসব বেদনা লাঘব করার জন্যও গান আছে যা সংগ্রহ করেছিলেন কালী বাবু,

“আর ধীর গো করিয়া কন মোর গদাই রে,
এক মাহ (এক মাস) হইলো আরো গদাই ব্যাটা
একবা খোয়ান মোকেরে
আর ধীর গো করিয়া কন মোর গদাই রে,
দুই মাহ (দু মাস) হইলো আরো গদাই ব্যাটা
দুইবা খোয়ানো মোকেরে”

এই গানের সব কথা ভালো বোঝা যায়না, তবে গদাই বলতে স্বামী বোঝানো হয়েছে বলে ভাবা হয়, আর প্রত্যেক মাসে এই গান হয় নয় মাস পর্যন্ত।

এইভাবে অনেক ধরণের গান সংগ্রহ করেছেন কালী দাশগুপ্ত। হালুয়ার গান (যে হাল বয়), জালুয়ার গান (যে মাছ ধরে), বৈদোর গান (গ্রামের ডাক্তার), বিয়ের গান (বিয়ের গানে শ্রেণী বিভেদ খুব চোখে পড়ার মতো, ধর্ম অনুযায়ীও বিয়ের গান বদলে যায়, আবার শ্রেণীর ক্ষেত্রে, গরীব হিন্দু আর ধনী হিন্দু দের বিয়ের গান এক নয়, একই ভাবে গরীব মুসলমান আর ধনী মুসলমান দের বিয়ের সংস্কৃতি বা গান এক ধরণের নয়), উত্তর বঙ্গ ও আসামের চা বাগানের গান, বাংলাদেশের পত্তনের গান, দেশভাগের গান, ভুতুলিয়ার গান, শিবের বিয়ের গান, ওঝা খোঁজার গান, জমিতে হাল দেওয়ার গান আরো অনেক অনেক বিষয়, যার সব কিছু এই স্বল্প পরিসরে লেখা মুশকিল।

কালী বাবুর কথায় কয়েকজন বড় মানুষের কথাও উঠে আসে, তার লেখায় এবং সাক্ষাৎকারে বার বার উঠে আসে রণজিৎ মন্ডলের গান, দোতারা (শ্রদ্ধেয় প্রতিমা বড়ুয়ার সাথে দোতারা বাজাতেন রণজিৎ মন্ডল), টগর অধিকারীর গান কথা বাজনা, মরুচমতি মাইঝানির গান (গ্রাম্য জীবনের হাস্যরসিকা), নিবারণ পন্ডিত এর সৃষ্টি, গান, লোকসংগীত চর্চা ও গবেষণা, এবং আরো অনেক অনেক মানুষের অভিজ্ঞতা ও গান যা লোকসংস্কৃতি চর্চা কে সমৃদ্ধ করেছে, উন্নত করেছে। এই সমস্ত কিছু বিশদে জানবার জন্য অনেক গভীর গবেষণা প্রয়োজন। আশা করি এই স্বল্প পরিসরেও এই যুগপুরুষ এর কাজ, সংগ্রহ, গান বাজনা প্রতিভা নিয়ে অন্তত কিছু কথা বলা গেল। তবে এ এক মহাসমুদ্র, তল খুঁজে পাওয়া ভার। আশা করি এই গবেষণা মূলক লেখা আমরা আরো লিখতে পারবো, এই মানুষ গুলো কে মনে করতে পারবো আর লোকসংস্কৃতি চর্চা কে জাগিয়ে তুলতে পারবো, ফিরিয়ে আনতে পারবো।

কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের মেল করুন, kothabriksha@gmail.com এই মেল আইডি তে।

Sources and references

1. The Study of Folk Music in the Modern World – Phillip V Bohlman
2. মোর বন্ধু কাজলভোমরা – কালী দাশগুপ্ত
3. http://www.kalidasgupta.com
4. Lokosaraswati works and documentaries
5. Living Bridges – Erach Bharucha

All rights reserved © Kothabriksha 2020

Published inEssayKothabriksha Sharodiya Edition 2020

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: