Skip to content

সময়ের নিঃশ্বাস-সপ্তর্ষি রায় বর্ধন | শারদীয়া সংখ্যা

Last updated on October 13, 2020

দয়ালবাবুর নাম সবাই জানে ঘড়িবাবু।

বাজারের মধ্যে এই দোকানটা বহু পুরোনো। কত পুরোনো তার হিসেব মোটামুটি পাওয়া যাবে দেওয়ালে টাঙানো বন্ধ হয়ে থাকা ঘড়িগুলোর দিকে তাকালে। দোকানটার পুরোনো হয়ে যাওয়া আসবাবগুলোও সেই ইংরেজ আমলের মনে হয়; বেশ্‌ একটা সাহেবী কেতা আছে তার কারুকার্যে; বাহারী কাঁচ দিয়ে সাজানো টানা আলমারীর ধারগুলো। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় এক সময় সেখানে হাতঘড়ি সাজিয়ে রাখা হত। দোকানটার ছাতে ঝোলানো অনেকগুলো টিউব লাইটের বাক্স। কিন্তু, তার কোনো টাতে একটার বেশী বাতি জ্বলে না। কে জানে কবে শেষ পালটানো হয়েছিল বাতিগুলো। আর রয়েছে মাকড়সার জাল! মশারীর মত আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে যেন দোকানের এদিক ওদিক। খদ্দের এলে বসবার জন্য গোটা চারেক কাঠের টুল আছে। হ্যাঁ, একসময় তাদের উপর ছিল নরম গদি আর রেশমি কাপড়ের ঢাকনা। এখন আর সেসবের বালাই নেই। ভেঙে পড়া ছোট ছোট এক একটা স্তম্ভের চতুষ্পদ উপস্থিতি তাদের এধারে ওধারে। দোকানে আজকাল খদ্দের আসে না বললেই চলে। কেউ আজকাল আর দম দেওয়া ঘড়ি কেনে না। জাপানীরা কিসব ব্যাটারি লাগানো ঘড়ি আবিষ্কার করেছে – সবাই আজ সেইসব হাল ফ্যাসনের ঘড়ি পছন্দ করছে। যারা এখনো দম লাগানো ঘড়ির মায়া ত্যাগ করতে পারেনি, দক্ষিণ শহরতলীর ঘড়িবাবুর দোকান হল তাদের একমাত্র সহায়। সত্তরের দশকে শেষ দিকের কোন এক সময়ে মায়ের হাত ধরে আমি প্রথম গিয়েছিলাম ঘড়িবাবুর দোকানে। তখন দোকানের এই ভগ্নদশা হয়নি। ঘড়িবাবু তখন ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত গোলগাল এক সুপুরুষ। একটা অদ্ভুত বাবরী গোছের চুল ছিল ভদ্রলোকের। মোটাভুরু – আর একটা কালো ফ্রেমের মোটা চশমা। কাঠের আলমারি গুলোর মাঝখানে একটা কাঁচে ঘেরা জায়গায় তিনি বসতেন। একদিকে ক্যাশ বাক্স – আর সামনে একটা ছোট্ট টেবিলের ওপর – হলুদ মখমলের কাপড় পাতা – তার ওপর নানা ধরনের ঘড়ির দেহ কাটা ছেঁড়া চলছে। প্রথম দর্শনেই আমার একটা ভয় চেপে বসল। ঘড়িবাবু বেশীর ভাগ সময় ঐ মোটা ফ্রেমের চশমা খুলে একটা আতস কাঁচের ঠুলি লাগিয়ে ঘড়ির নাড়িভুঁড়ি নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করতেন। আমার খুব ভয় লাগত ওনার এরকম চেহারাটা। আতস কাঁচের ঠুলি ছাড়া নাকি ঘড়ির কাজকর্ম করা যায় না; আর দীর্ঘদিনের অভ্যাস (অথবা বদাভ্যাসে) ঘড়িবাবুর দুচোখের নীচে কেমন যেন কালি পড়ে গেছিল।

বাড়িতে তখন দাদু, দিদা, বাবা আর মা – চারজনের চারখানা হাতঘড়ি। তার উপরে আছে দুখানা গোল গোল অ্যালার্ম ক্লক আর একখানা চাবি মোচড়ানো দেওয়াল ঘড়ি। সময়ে অসময়ে এদের মধ্যে কেউ না কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ত। সবথেকে ভয়ঙ্কর রোগ ছিল বিনা কারণে দুম করে বন্ধ হয়ে যাওয়া। ব্যস্‌ দক্ষযজ্ঞ ! প্রথমেই কারণ অনুসন্ধান; তারপরে সেটাকে জাগিয়ে তোলবার জন্য দম দেওয়া, নাড়াচাড়া – না হলে দু-তিনটে চড়থাপ্পড় অথবা টুস্‌কি ! এরপরেও না চললে ঘড়িবাবুর নাম স্মরণ। আমার যতদূর মনে পড়ে, এমন কোন সপ্তাহ যেত না – যেদিন ঘড়িবাবুর হাসপাতালে আমাদের বাড়ির কোন রুগী ভর্তি হয়নি। এ নিয়ে বাড়িতেও কম অশান্তি হত না। সে সময়ে আমাদের ঘড়ি মেলানো হত আকাশবাণীর ঘোষণার হিসেবে অথবা ভোর ন’টায় ভোঁ বাজবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। একদিন হল কি, বিদ্যুতের লাইনে কি সমস্যা হওয়াতে, আমাদের ঐ অঞ্চলে ভোররাত থেকেই সব বন্ধ। তখন ছিল ইলেকট্রিক রেডিও – সে মৌন নিয়েছে। দাদুর ভরসা ছিল ফ্যাক্টরির সাইরেন। নাঃ – সেও বাজল না। ঘটনাচক্রে, সেদিন বাড়িতে ছিল একটা অ্যালার্ম ঘড়ি, দেওয়াল ঘড়িটা আর দাদুর হাতঘড়ি। দু’জন দয়ালবাবুর হাসপাতালে – বাকি দু’জন তাদের মালিকের কব্জিতে। দেখা গেল সকালবেলায় তিনটে ঘড়ি বন্ধ। আমার দাদু ডাক্তার ছিলেন। ঘড়ি ধরে তার চলাফেরা। নিজের হাতঘড়িতে কষে দম দিয়ে তিনি বসেছিলেন কখন রেডিওতে ঘোষক বলেন “স্টুডিওর ঘড়িতে এখন – ”। পরক্ষণেই কান পেতেছিলেন সাইরেন বাজার আশায়। কাকস্য পরিবেদনা !! বোঝা গেল পৃথিবীর সময়ের হিসেব এই মুহূর্তে এই বাড়িতে কারো কাছে নেই। এমতাবস্থায়, দাদু উপায় না দেখে তার এক রুগীকেই ফোন করে বসলেন ক’টা বাজে জানবার জন্য। রুগীতো মহাখুশী। ডাক্তারবাবু নিজে ফোন করে ওষুধ খাচ্ছ কিনা জিজ্ঞেস করছেন। পরে বুঝলাম দাদু জিজ্ঞেস করেছেন “সময়ে সময়ে ঠিক ঠিক ওষুধ খাচ্ছ তো হে” ? 

    রুগীর উত্তর – “আজ্ঞে হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, এই তো এখুনি সকাল ১০টার বড়িটা খাব – ”। “ঠিক আছে, রাখি তবে”, বলে হুড়মুড় করে ফোন নামিয়ে রেখে, দাদু ঘড়ির কাঁটা ঘোরালেন – “এখন তবে দশটা” ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘড়িবাবুর দোকানের ছিরিছাঁদ বদলাচ্ছিল। হাল ফ্যাসানের ঘণ্টা বাজা ঘড়িতে বাজার ছেয়ে গেছে। দোকানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নানা ঘড়িতে নানা রকম ধ্বনি শোনা যায়। কিরকম একটা অদ্ভুত ঐকতানের সৃষ্টি হয়। আমি কাঠের টুলের উপর বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করি কোন ঘড়ি থেকে কি সুর ভেসে আসছে। পারি না। মনে হয় সুরের একটা মহাসমুদ্রে ঢেউ উঠছে আর ভাঙছে; কয়েক মুহূর্তে সব চুপচাপ। মাথার উপর শুধু খস্‌খস্‌ করে পাখা ঘোরার আওয়াজ। 

    একদিন আমাদের দেওয়াল ঘড়িটা গেল বন্ধ হয়ে। ওটার ঢং ঢং আওয়াজ শোনা যেত আমাদের সারা বাড়িতে। ওটার সময়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল বাড়ির অনেকরকম কাজ। অফিস, স্কুল তো বটেই – দাদুর ডাক্তারি, দিদার পূজা আচ্চা, চায়ের পাতা ভেজানো, আমার পড়তে বসা, রান্নার বুড়িদিদির পান আর দোক্তা পাতার খিলি মুখে ঢোকানো – সবাই বাধ্য ছাত্রের মত মেনে নিত ঘড়িটার  সময়ানুবর্তীতা। এই হেন ঘড়ি – একদিন চুপ মেরে গেল। মা আর আমি ঘড়িটাকে খবরের কাগজে মুড়ে, আগলে নিয়ে এলাম ঘড়িবাবুর দোকানে।

    আমার চোখের সামনে ঘড়িবাবু পটাপট খুলে ফেলতে লাগলেন ঘড়িটার এটাসেটা; আধঘণ্টা বাদে সেই দেওয়াল ঘড়ির এমন অবস্থা হল – আমার তো ভয় হতে লাগল যে এ ঘড়ি আর কোনদিন জোড়া যাবে কিনা। 

    ঘড়িবাবু কিন্তু একটা অভয়ের হাসি দিলেন। চুকচুক করে একটা ধুসর হয়ে যাওয়া কাঁচের গ্লাস থেকে বেশ খানিকটা জল খেলেন। দুই টিপ্‌ নস্যি নিয়ে নাকে গুঁজতে গুঁজতে বললেন “মনে হয়, অয়েলিং করলেই হইয়্যা যাইবো; যদি দরকার হয় দুইখান স্প্রিং দিমু না হয় বদল কইর‍্যা; রাইখ্যা যান এই টারে”। 

    আমার মা নিশ্চিত। যাক্‌, তবে আশা আছে। যে বছর আমি মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করলাম – হাতে পেলাম একটা ব্যাটারি চালিত ঘড়ি। এই ঘড়িতে দম দিতে হয় না। শেষ হয়ে গেলে নতুন ব্যাটারি লাগাও খালি। সময়ের নিয়মে তাও শেষ হল একদিন। এবার ঘড়িবাবুর দোকানে হাজির হলাম মনে একটা আশঙ্কা নিয়ে। আমি একাই এসেছি। “কিরে কি খবর তোর” – মুখ তুলে, ঠুলি সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ঘড়িবাবু। বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। চোখের দৃষ্টিও খানিক ঘোলা।

“এই তো ভালো – দ্যাখো না এই ঘড়িটা চলছে না” – 

“কই দেখি” ?

এবার আবার ঘড়িখানা হাতে নিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন তিনি। 

“ব্যাটারিটা গ্যাসে মনে হয়” – 

ব্যাটারি বদল করতে করতে ঘড়িবাবু বিড়বিড় করতে থাকেন – “এই হয়েছে আজকাল সব যন্ত্র। দুদিন চলে – তারপরেই ফুস্‌ – ”। 

    কাজ হয়ে যেতে আমি বললাম কত দাম দেব এটার। “এখন কিসু দিতে হইবো না। তোর মা গোটা দুই ঘড়ি ঠিক করতে দিয়া গেসে। আইব কয়দিন পর; তখন একবারে টাকা নিয়া নিমু – সাবধানে বাড়ি যা”। সত্যি মা পারেও বটে ! কোন বন্ধ ঘড়ি দেখলে যেন কিরকম অস্থিরতা কাজ করে। কাজ শুরু আর শেষ করার খুব তাগিদ। আর তার জন্য দরকার সময়ের হিসেব নিকেষ। মাঝে মাঝে মনে হত এত সময় মেপে কাজ করে কি লাভ; আধঘণ্টা এদিক ওদিকে কি এসে যায়।

এ কথা বললেই মা আমাকে নানা বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিতে বসত। 

“এই ধর তোর পরীক্ষার খাতা যদি কেউ ১০ মিনিট আগে কেড়ে নেয়, তুই ছেড়ে দিবি” ? 

সত্যিই তো !
সে বছর আমি চাকরি পেয়েছি। মায়ের চাকরি জীবন শেষ হবে আর কয়েকমাস পরেই। কয়েকদিন ধরেই মা কে খুব মুমূর্ষ দেখছি। জিজ্ঞাসা করলেই বলত – আর তো কয়েকদিন রে – তারপর যে কি হবে। সব ব্যস্ততার শেষ। কি করে সময় কাটাব বলতো” ? বেশ কয়েকমাসের টাকা জমেছে – ভাবছি মা-কে কি কিনে দেওয়া যায়; অফিসের পাশেই একটা সুসজ্জিত ঘড়ির শোরুম। জয়িতাই দিল আইডিয়াটা। 

    “শোন, কাকিমার জন্য একটা ঘড়ি কেন”। “মা-এর এখন ঘড়িতে কি কাজ – তাও আবার নতুন ঘড়ি” ? প্রশ্নটা করেই যেন আমি নিজের ভেতর থেকেই উত্তরটা পেলাম। ব্যস্ত জীবন থেকে অবসর নিলেও, তার অবকাশ কে জানা দরকার ঘণ্টা মিনিটের নিরীখে।

জয়িতা সাহায্য করল ঘড়িটা কিনতে। সেদিন মা, ফিরেছে বাড়ি। সঙ্গে এত এত উপহার, ফুলের তোড়া, মিষ্টির প্যাকেট আর চোখের কোনে জল নিয়ে। দাদু আর বেঁচে নেই তখন। থাকলে হয়ত দিতেন বকুনি নিজের মেয়েকে। 

বাড়িতে একটা শোকাবহ পরিস্থিতি ! আমি অফিস থেকে ফিরে গুটি গুটি মায়ের কাছে এলাম। ঘড়ির বাক্সটা হাতে দিয়ে বললাম “আজ  থেকে নতুন ভাবে সময়ের হিসেব রাখবে”। খুব পছন্দ হল। চোখ মুছে এই প্রথম হাসল মা। বাবা একটা তির্যক মন্তব্য করতে ছাড়ল না “যাক্‌, ঘড়িবাবুর আরেকটা রুগী বাড়ল”। 

তারপর কেটে গেছে আরও কিছু বছর। কলকাতা বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। এখন পাড়ায় পাড়ায় মল, মাল্টিপ্লেক্স – নিয়ন আলোয় মোড়া হরেক কিসিমের ঘড়ির দোকান। আমাদের ঘড়িবাবুর দোকান বিলুপ্ত প্রায়। 

মা-এর অবকাশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হয়েছে। শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। খুব দরকার না পড়লে আজকাল আর রাস্তাঘাটে বেরনো হয় না। মা কিন্তু এখন হাতে আমার দেওয়া ঘড়িটা পড়ে থাকে। আর মাঝে মাঝে চোখের খুব কাছে এনে দেখে সেকেন্ডের কাঁটাটা টুক্‌টুক্‌ করে এগুছে কিনা। একদিন বলল, “জানিস, ঘড়িটা আজকাল ১০ মিনিট দেরীতে চলে – প্রত্যেকদিন” জননী “ শুরু হয়ে বেশ খানিকটা হয়ে যায় – তারপর টিভি খুলি – কি ঝামেলা বলত” ! মৃদু হেঁসে আমি আশ্বস্ত করলাম – ঠিক আছে, আমি ঐ শোরুমে নিয়ে যাব – দিয়ে দিও।।

বুঝলাম কথাটা পছন্দ হয় নি খুব একটা।

“ঠিক আছে – আমি না হয় ঘড়িবাবুর ওখানেই ঘুরে আসব”।

এবার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল। এর কয়েকদিন পরেই সেই সাঙ্ঘাতিক খবরটা এলো। মায়ের রক্তে রক্তে তখন ছড়িয়ে পড়েছে বিষ – শরীরটা ঝাঁঝড়া হয়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। ডাক্তার, চিকিৎসা, হাসপাতাল, ওষুধ, পথ্যি এসবের মধ্যে আমাদের বাড়িটা যেন কেমন হঠাৎ বদলে গেল। 

একদিন দেখলাম মায়ের হাত শীর্ণকায়। ইনজেকশনের ছুঁচ ঢুকে ঢুকে শিরাগুলো বিভিন্ন জায়গায় ফুলে ফুলে উঠেছে। 

আমার দেওয়া ঘড়িটা এখন রাখা আছে বিছানার পাশের টেবিলে। নিরবিছিন্ন, অক্লান্ত ভাবে সে এখন মেপে চলেছে পল অনুপল। রাতে শুতে যাবার আগে মায়ের অন্ধকার ঘরে ঢুকলে চোখ পড়ত ঘড়িটার দিকে। রেডিয়াম জ্বলা চোখ দিয়ে সে যেন তাকিয়ে দেখে আমাদের। সেবার পুজোতে হঠাৎ কি একটা কাজে গেলাম সেই বাজারের ভিতরে। হঠাৎ মনে হল, যাই একবার ঘড়িবাবুর দোকানে। কেমন আছে দোকানটা দেখে আসি। দূর থেকে দেখলাম ঘড়িবাবু তার নিজস্ব জায়গায় নেই। তিনি একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন চুপ করে।

“কেমন আছ” ?

আমার কথায় যেন সম্বিৎ ভাঙল ঘড়িবাবুর। “আরে তুই, কেমন আছিস্‌ ? কি করিস এখন তুই ? মা কেমন আসে রে” ? – 

একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করে একটু নিঃশ্বাস নিলেন। মায়ের শরীর খারাপের কথা বলে বেরিয়ে এলাম আস্তে আস্তে। মনে হল আমার শৈশবের একটা মোড়ক কেউ মেলে ধরল আমার চোখের সামনে। মা চলে গেল নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই। অফিস থেকে হাসপাতাল – সেখান থেকে বাড়ি – তারপর শশ্মানঘাট। 

যেরকমটা হয়ে থাকে – শোকে সন্তাপও একদিন লঘু হয়ে আসে। আমিও ফিরলাম কাজ কম্মের মধ্যে আবার। একদিন অফিস বেরুনোর সময় হাতঘড়ি পড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে হল – আচ্ছা মায়ের সেই ঘড়িটা কোথায় গেল। বাবাকে জিজ্ঞেস করাতে, কোন যুৎসই জবাব পাওয়া গেল না। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর রণে ভঙ্গ দিতেই হল। মনকে বোঝালাম, যার ব্যবহারের জিনিস সেই নেই – তা ঐ ঘড়ি আমার কোন কাজে লাগত। যাক্‌, যার কাছে আছে, তারই কাজে লাগুক। প্রায় ভুলেই গেলাম ঘড়িটার কথা। 

এর প্রায় ছমাস পরে, একদিন কলকাতায় ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী হয়েছে। রাস্তাঘাট জলে থৈ থৈ। বাড়ি যেতে পারব কিনা জানিনা। সেই বাজারের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এখনও বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে। অবনিদার চায়ের দোকানে ঢুকে এক কাপ চা নিলাম। হঠাৎ চোখ গেল হাতঘড়ির দিকে। যাঃ। ঘড়িটা কখন বন্ধ হয়ে গেছে কে যানে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি রাত সাড়ে আটটা। চা খাওয়া শেষ হতেই ভাবলাম, ঘড়ির ব্যাটারি তবে বদলে নি। একাজ অফিসের পাশেও হত। তবু কেন যেন মনে হল যাই একবার বাজারের ভেতরে ঘড়িবাবুর দোকানে। দোকানটা দূর থেকে দেখলাম খোলা আছে। মাথার জল ঝেড়ে ঢুকলাম। দেখি ঘড়িবাবু যথারীতি সেই কাঠের চেয়ারে।

    বুঝলাম চিনতে পারেন নি। কাছে গিয়ে মুখ নামিয়ে বললাম – “চিনতে পারছ – ?” একটু বিস্ময় – তারপর মুখে হাল্কা হাসি – আরে তুই – কেমন আছস্‌” ?

“এই তো ভাল – যা বৃষ্টি – দেখ না হাতঘড়িটা কিরকম থেমে গেছে হঠাৎ করে – একটু দেখে দাও তো”। 

“কমল – ও কমল, ঘড়িটা দেখ তো রে বাবা – কি হইল”। “তর মা কেমন আসে ? শেষবার আইল যখন ভালই তো দেখলাম; কি শরীর খারাপ হইসিল কইল ………… আর, একখান ঘড়ি দিয়া গেসিল ঠিক করনের জন্য – দাঁড়া তো, ভালই হইসে তুই আইসস্‌ – লইয়া যা”। এই বলে ঘড়িবাবু ধীরে ধীরে ভিতরে চলে গেলেন।

কমল ছেলেটি অনেকক্ষণ খুট্‌খাট করে বলল – “দাদা, এর সার্কিট-এ সমস্যা আছে, বুঝলে – মনে হয় জল টল ঢুকেছে – রেখে যাও, সময় লাগবে” – 

“তা বেশ, রেখে দাও তবে – একটু তাড়াতাড়ি করে দিও – ঘড়ি ছাড়া হাতটা কেমন খালি খালি লাগে – ”

কথা বলতে বলতে কখন যে ঘড়িবাবু এসে দাঁড়িয়েছেন আমার পাশে খেয়াল করি নি।

“এই নে, তোর মায়ের ঘড়িখান – এখন আর স্লো হইব না – ঠিক কইর‍্যা দ্দিসি” – 

ঘড়িবাবুর হাতে দুই আঙুলের মাঝে ঝুলছে মায়ের সেই প্রিয় ঘড়িটা যেটা আমি কিনে দিয়েছিলাম। চক্‌চক্‌ করছে তার সোনালি শরীর – যেন হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে।

কিন্তু আমি থমকে গেছি। এ ঘড়ি এখানে এলো কি করে। কে দিয়ে গেল; কবেই বা দিল।

ঘড়ির সঙ্গে সুতো দিয়ে বাঁধা এক টুকরো কাগজ যেটার গায়ে ঘড়িবাবু লিখে রাখেন নাম, ফোন নং আর যেদিন ঘড়িটা দোকানে এলো সেই তারিখ। 

কাগজ পালটে দেখলাম তারিখটা ১০ই নভেম্বর ২০০৮। 

মা চলে গেছেন নয় তারিখে।।

কব্জিতে মায়ের ঘড়ি বেঁধে বেরিয়ে এলাম বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাস্তায়। 
 

Copyright © Kothabriksha 2020, All Rights Reserved.

Published inKothabriksha Sharodiya Edition 2020Story

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: