Skip to content

‘নিজের গান গাইবো, স্বপ্ন ছিল’ – লোপামুদ্রা মিত্র | শারদীয়া সংখ্যা

Last updated on October 13, 2020

সঙ্গীত শিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র

“মাঝে মাঝে একটু রক্তাক্ত হওয়া দরকার , পরবর্তীকালে যাতে অনেক কিছু সহ্য করে নেওয়া যায়, সহ্য করে নিয়ে চলা যায়..”   

Covid সিচুয়েশন তো কি হয়েছে? ব্যস্ততা একটুও কমেনি! সেই ব্যস্ততার ফাঁকে ঠিক সময় বের করে কথাবৃক্ষের সহ-সম্পাদক, শ্রীতমার সাথে বেশ কিছু কথা ভাগ করে নিলেন আমাদের সবার প্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রীমতী লোপামুদ্রা মিত্র।

১. স্টেজে দাঁড়িয়ে ৫০০ লোকের সামনে গান গাইবো এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এক নাম চিনবে,এরকম কোনো ইচ্ছে বা স্বপ্ন কি ছিল কখনো ?


হ্যাঁ ছিল তো, ক্লাস টেন থেকে শুরু হয়েছিল । নিজের গান নিজে গাইবো ,আমার গানের নামে আমাকে সবাই চিনবে ! জেদ নয় ঠিক, তবে স্বপ্ন ছিল। 


২. স্বপ্ন টা যখন পূরণ হলো তখন কেমন অনুভূতি হতো বা হয়?


যখন পূরণ হলো তখন খুব ভালো লাগতো, একটা সময় সত্যিই খুব ভাল লাগত যখন বলতে পারতাম মানে এখনো বলতে পারি যে আমার এতগুলো গান আছে। ইদানীংকালে খুব কষ্ট হয় কিছু কিছু জিনিস ভেবে, কারণ আমরা যে সময় বাংলা গানটা গাইতাম বা এখনো গাইছি, জানিনা গানগুলোকে ঠিক বাঁচিয়ে রাখতে পারবো কিনা…

৩. ভালো গান গাইতে পারলেই কি ভালো পারফর্মার হওয়া যায়?

পারফর্মিং আর্ট একটা অন্য জিনিস, শুধুমাত্র  নিজের জন্য গাওয়া একটা ব্যাপার, অন্য দিকে, গান গাইছি  এবং সেটা মানুষের যাতে ভালো লাগে সেটা খেয়াল রাখা আবারএকটা আলাদা ব্যাপার। সেই হিসেবে, সব দিন তো সমান মন বসেনা বা মনের অবস্থা সমান থাকে না, শ্রোতা-দর্শক কি চাইছে, কতটা কথা বলবো, কতটা কথা বলবো না সেগুলো মাথায় রাখা খুব জরুরি। সেই সব সময় নিজের পারফরমেন্স টা মেকানিক্যাল একটা পারফেকশানে নিয়ে যাওয়া সেটা জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ।

৪.সেটার জন্য কি ট্রেনিং নেওয়া জরুরি ?

অনেকেই এখন ট্রেনিং নেয় কিন্তু আমি যার কাছে শিখেছি তিনি বলতেন সেই ট্রেনিং টা কোথাও গিয়ে একইরকম হয়ে যায়, উনি বলতেন  “ব্রয়লার মুরগি” … বলতেন, ”আমার কাছে যেটা পাবে সেটা অন্য আরেকজনের কাছেও পাবে”, সুতরাং নিজস্বতা নিয়ে নিজের মতো করে গান গাওয়া, নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অভিজ্ঞতা, তার সাথে  জীবনবোধ, বিভিন্ন মানুষের সাথে মেলামেশা। এগুলো খুব দরকার সুতরাং ঘরে বসে থেকে সেই জিনিসটা হবে না।

৫.তুমি যখন প্রথম পারফর্ম করা শুরু করলে , সেই সময়কার লাইভ পারফরমেন্স এবং এখনকার লাইভ পারফরমেন্স এর মধ্যে  কতটা পরিবর্তন ঘটেছে ?

তখন এত আলোর খেলা, ভালো মাইক্রোফোন, সাউন্ড সিস্টেম কিছুই ছিল না। আমরা যা খুশি তাই তে গেয়েছি ,এমন অনেক সিস্টেমে গেয়েছি যেই  সিস্টেমে হয়তো গান গাওয়া যায় না ! “দাদ হাজা মলম বিক্রির মাইক্রোফোন বলতাম আমরা” (হা হা করে হেসে).. সেই মাইক্রোফোনে গান গেয়েছি তাতেও মানুষের ভালো লেগেছে, এরকম ও হয়েছে যে বাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে গান গেয়েছি।সবরকম অভিজ্ঞতাই আছে! যুগের সঙ্গে আমরাও পারি পাল্লা দিতে  এবং  এই পরিবর্তনেই  সাথে পাল্লা দেওয়া টা আমাদের কিন্তু হেল্প করেছে। একটা সময় তো মনিটর ই থাকতোনা, এখনতো in-ear হেডফোনস না হলে আমাদের অসুবিধা হয়!সবাই আমরা অভ্যাসের দাস!

৬.Covid-19 কি নতুন কিছু শেখালো?

শিখিয়েছে বাড়িতে বসে থাকতে হবে ! আমি জীবনে কোনোদিন বসে থাকি নি বাড়িতে।  covid ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে মানে এই যে থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় সেটার সাথে অভ্যস্ত হওয়া, বাড়ির অনেক কিছু ভালো না লাগার জিনিস গুলো সহ্য করা, দমবন্ধ করা জায়গা থেকে নিজেকেই নিজে বের করে নিয়ে আসা। ..এসব তো শিখিয়েইছে। যেটা আমরা করছি এখন মানে এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে লাইভ পারফর্ম করছি সেটাতে আর একটু পারফেকশনের দরকার হচ্ছে আর অডিয়েন্সের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন এর আনন্দটা ভীষণভাবে মিসিং। 

৭. এই সিচুয়েশন এর বহু  শিল্পী সাফার  করলেন ..

করছি আমরা সাফার, হয়তো লোকে বলবে এতদিন ধরে গান গাওয়ার পরেও আমি কি করে এই কথা বলছি বা কেন বলছি কিন্তু এটাই সত্যি।  প্রথম কথা, মানসিক অশান্তি হচ্ছে একটা, অবশ্য সেটা যে কোন সময় হতে পারতো, আমার গান আর মানুষের ভালো লাগছে না শুনতে, আমাকে ডাকছে না আর কেউ কোনো অনুষ্ঠানে এরকম হতেই পারতো বা পারে কিন্তু যেটা ভীষণভাবে মনে কষ্ট হচ্ছে যে আমরা  রেগুলার পারফর্ম করতে পারছিনা যেমনটা করতাম এবং আর্থিক দিক থেকে দেখতে গেলে শুধু নিজের জন্য নয়, সাথে আরও ১৪ জনের খাওয়া-পরার চিন্তা..।সবকিছুই কেমন হয়ে গেছে হঠাৎ করে। যতটা সম্ভব সবাই মিলে চেষ্টা করা হচ্ছে এই সমস্যা গুলো মেটানোর। 

আমার মনে হয় এই কষ্টের সিচুয়েশন দিয়ে যাওয়াটা খুব দরকার, মাঝে মাঝে একটু রক্তাক্ত হওয়া দরকার, পরবর্তীকালে যাতে অনেক কিছু সহ্য করে নেওয়া যায়, সহ্য করে নিয়ে চলা যায়.. তাই এইসব কঠিন সময়গুলো বোধহয় খুব দরকার সবার জন্য।

৮.বেণীমাধব, হেইগো মা দূর্গা, সাঁকোটা দুলছে, মুশকিল আসন, ডাকছে আকাশ….এই গান গানগুলো তো থেকে গেলো কিন্তু যে এই অত্যন্ত জনপ্রিয় গান গুলির  সৃষ্টিকর্তা সে চলে গেল ..এই শুন্যতা কি বর্ণনা করা যায় ?

এই মানুষটি অনেক বছর ধরে স্টেজে বা মানুষের সামনে আসেন না।  ওনার না থাকাটা আমার জন্য একটা বিরাট ভ্যাকুয়াম। ভাল-মন্দ-খারাপ আমি সবটাই শেয়ার করতাম এই মানুষটার সাথে। মহালয়ার দিন প্রথম ওপেন স্টেজ করেছি এই সিচুয়েশন এর মধ্যে , তখনই মনে হলো যে আরে বলা হলো না তো যে আজ বেরিয়েছি গান গাইতে ! এই শূন্যতা থাকবেই, তবে  সবথেকে বড় কথা গান বাজনার ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো আমার ভিতর কাজ করে , মানে অনেক সময় কবিতার লাইন ভুলে গেছি বা অন্য কিছু মনে পড়ছে না সেই সব প্রশ্নগুলোর জায়গা ওই মানুষটা ছিল। 

[ সমীর চট্টোপাধ্যায় একজন বিশিষ্ট সঙ্গীত স্রষ্টা (সুরকার ও গীতিকার) এবং বাংলা গানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য, লোপামুদ্রা মিত্র তাঁর নানা সাক্ষাৎকার এ বলেছেন যে এই মানুষটা সেরকম ভাবে কখনো সামনে আসেন নি, আড়ালে থেকেই কাজ করে গেছেন, বাংলা গান কে সমৃদ্ধ করে গেছেন, এমন মানুষের কাজ বাংলা গানের এবং বাংলা সংস্কৃতির এক বিরাট সম্পদ হয়ে থাকবে ]

৯.সংগীত জগতের জন্য কতটা ক্ষতি ওনার না থাকাটা ?

অনেকদিন কাজ করেননি উনি। সত্যি কথা বলতে লস এর থেকেও আমার মনে হয় যে আমি যদি ওঁর গানগুলো রেকর্ড করে রাখতে পারতাম , খুব ভালো হতো।  এখন খুব আপসোশ  হয় যে কেন করে রাখিনি। সেই গানগুলো কতটা লোকসম্মুখে যেতো , সেটা পরের কথা কিন্তু গানগুলো রেকর্ড  করে রাখা উচিত ছিল এবং এই বিষয়ে আমার খুব মনে মনে হয় আমি অন্যায় করেছি।  এরপর আরও কেউ যদি গায়, যেমন ওনার অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে কিন্তু তারা কতটা ওই জায়গাটা বুঝে গাইবেন আমি ঠিক জানিনা। কারণ অনেক সময় এমন হয়েছে , অন্য কাউকে দিয়ে গান গাইয়েছেন, তারপর আমাকে আবার বলেছেন যে “এটা তুই গা তো আরেকবার” ….আসলে খুব ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে পথ চলা আমাদের। একদিকে আমার বড় হওয়া , অন্যদিকে কাকার গান লেখা, সবটাই দুজনে মিলে মানে একটা জয়েন্ট ভেঞ্চার।  (একটু হেসে) সাউন্ড বক্স বলতেন আমাকে। 

১০.পুজো তো চলেই এলো , এই অন্যরকম পুজোয় কি কোনো স্পেশাল প্ল্যান আছে ?

কোন প্ল্যান নেই !! এইবারের পুজোটা শুধু একটা ভাবেই স্পেশাল সেটা হচ্ছে বছর তিরিশ  পর কোন অনুষ্ঠান নেই.. কিন্তু সেটা একটুও ভালো লাগছে না। অন্য যা কিছু থাকুক বা না থাকুক এই যে পারফরম্যান্স, গান, হই হুল্লোড় করে  অনুষ্ঠান সবাই একসঙ্গে মিলে সেটা তো সত্যি ই খুবই মিস করব এবং এটা আমাদের ফুল টিমের ক্ষতি কারণ আমরা এই সময় টা তেই  বেশি অনুষ্ঠান করি।  এই যে পুজোর season টা তো আমাদের জন্য  শুরু হয়ে যায় সেই মহালয়া থেকে।  সেই দিক থেকে খুবই মন খারাপ। 

বহু মানুষ পুজোর বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকে তাদেরও তো এখন একই অবস্থা, সেই জায়গা থেকে জানিনা দুঃখ করাটা ঠিক কিনা তবে আমার পার্সোনালি ভীষণ মন খারাপ। একটা অনুষ্ঠান হয়েছে মহালয়ার দিন এর পরেও কিছু গান বা অনুষ্ঠান হবে ছোটখাটো কিন্তু এখনো পর্যন্ত স্টেজ এ দাঁড়িয়ে কোনো  অনুষ্ঠান বা পারফরম্যান্সের গল্প নেই।  

১১.তুমি কতটা আশাবাদী ? কি মনে হয় , সামনের বছর থেকে আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে ?

যে ফিনান্সিয়াল জায়গাটায় আটকে গেছে গোটা পৃথিবী সেই জায়গায় আগে তো মানুষ খাবে তারপর গান শুনবে ! সুতরাং আগে খাওয়া তারপর তো এন্টারটেনমেন্ট টাকা দেওয়া।  সেই দিক থেকে ভাবতে গেলে মনকে প্রস্তুত রাখছি , যেটাই  হবে সেটাকে মেনে নিয়ে চলতে হবে।  আশাবাদী তো হয়ে আছি বটেই কিন্তু তার সাথে মনকে প্রস্তুত ও রাখছি।

 ১২.কথাবৃক্ষ এর পাঠক দের  উদ্যেশে যদি কিছু বলো 

বই আকারে যখনই কোনো কিছু বেরোয়  সেটাই ভালো লাগে  কারণ এখনো কিছু মানুষ বই পড়ার জন্য বসে থাকেন এবং তাদের বই জোগানোর জন্য একদল মানুষ কাজ করেন। এটা একটা খুব ভালো লাগার জায়গা। কেউ মন দিয়ে কোন কিছু করলেই ভালো লাগে, কেননা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ যখন  কিছু পড়বে মনে করে তখনই পড়েন কারণ ধৈর্য টাই নেই মানুষের , একটা পোষ্টের উপর দুটো লাইন লেখা আছে সেটুকু ও পড়ে না  মানুষ, তো সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন একটা ম্যাগাজিন চলছে  এবং কিছু মানুষ সেটা পড়ছে ভালোবেসে সেটা একটা বড় জায়গা।  সেই জন্য আমার অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা !

সাক্ষাৎকার: শ্রীতমা বসু

Copyright © Kothabriksha 2020, All Rights Reserved.

Published inFeature WritingInterviewKothabriksha Sharodiya Edition 2020Music

One Comment

  1. Titas Titas

    Shakkhatkar ki pore khub aanondo pelam. Lopa di aamar idol. Tai onar sobtaai aamar bhalo laage. Uccho maaner gaayikar shathe uni ekjon sposhtobokta. Aabar khub hoihullor korteo pichhopa hon na. Maatir manush. Kono ohong nei. Ja koren, pran mon dhele. Onek onek kichhu shekhar aachhe onar kaachh theke.
    Dhonnobad Kathabriksha ei shakkhatkar tir jonno. Ei Sharodiya-ay eta prothom paowa. 😊❤🙏

Leave a Reply

%d bloggers like this: