Skip to content

অন্তরে ভুল ভাঙবে কি…?! – সম্পাদকীয়

‘অবান্তর’ পত্রিকার কর্ণধার চিরকুমার রে।না না উনি মোটেই চির কুমার নন ।আসলে হয়েছে কি, তাঁর বাবা ছিলেন রবীন্দ্র ভক্ত  মানুষ চিরকুমার সভা নাটকটি তিনি পড়ার পরই ছেলের জন্ম হওয়ায় তার নামকরন করেন  চিরকুমার।তবে নাটকে অতজন পুরুষ চরিত্রকে ছেড়ে দিয়ে  ছেলের এই নামটিই কেন রাখলেন তা বলতে পারব না।তাই এক জাঁদরেল গিন্নি ও ৩ ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঘোরতর সংসারী মানুষটি আজও নামে চিরকুমারই রয়ে গেছেন।এমনকি, সেই নাটকের মতো হুইস্কি,সোডা,মুরগি বা মটনের প্রতিও তাঁর একেবারে লোভ নেই।সে ওই যা একটু আছে তা হলো তাঁর তেলেভাজ প্রতি দুর্বলতা। এতেও হয়েছে চিত্তির।নামের আদ্যক্ষরের সাথে এই শখ মিলিয়ে তাঁর  অধস্তন কর্মচারীরা তাকে চিড়েভাজা বলে থাকেন।তা আজ তাঁর মেজাজটি বেজায় তিরিক্ষি হয়ে  রয়েছে।এই সপ্তাহের শেষে ‘সপ্তাহের হাবিজাবি’ ক্রোড়পত্রেছাপানোর মতো কোনো লেখা জোগাড় হয়নি।তারওপর তার আপিসের নতুন দুটি ফচকে ছোড়া  জুটেছে কোনও কাজই হয় না যাদের দিয়ে।সাত পাঁচ ভেবে ওই দুজনকেই তলব করলেন চিড়ে…থুড়ি চিরকুমার বাবু।

প্রশ্ন পুরকায়স্থ আর সন্দেহ সরখেল। ‘অবান্তর’ পত্রিকার দুই তরুণ সাংবাদিক চিরকুমার বাবুর গালি খেয়ে বেরিয়েছে খবর সংগ্রহে।বাইশে শ্রাবনের বিশেষ সংখ্যা তাই একেবারে খোদ বিশ্বকবির বিশ্বভারতীতে হাজির।ভালো খবর না হলে চাকরি নট হওয়ার হুমকি  কপালে ঝুলছে যে।এধার ওধার ঘুরে,উদয়ন ছাড়িয়ে যেই শ্যামলীর  সামনে এসেছে দুজনে,তাদের শ্বাস বন্ধ হওয়ার  জোগাড়।একি! বাড়ির দাওয়ায় বেতের মোড়ার ওপর এ যে  স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসে!স্থান কাল সত্যি মিথ্যে ভুলে প্রশ্ন আর সন্দেহ সোজা ডাইভ মারে কবির পায়ে। 

‘স্যার স্যার… গুরুদেব…. একটা ইন্টারভিউ দিতেই  হবে বস্ … নইলে দুজনের চাকরি নিয়ে টানাটানি  পরে যাবে বেঘোরে …’

কোনও সাড়া না পেয়ে দুজন মুখ তুলে দেখে, দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন তিনি।চোখ পড়তেই বললেন,

‘আরে ওঠ,ওঠ … আমি তো এখন তোদের নশ্বর  জগতে বাস করি না রে .. এখন এখানে লক না  আনলক কিসব চলছে তোদের সব দেখি কেমন  ফাঁকা ফাঁকা তাই দুদণ্ড নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে একটু জিড়িয়ে নিচ্ছিলাম .. আমার আবার  ইন্টারভিউ কি রে!’

প্রশ্নঃ বেশী সময় নেব না গুরুদেব .. এই এট্টু ছোট্ট করে আর কি …(তাঁর মুখে প্রশ্রয়ের হাসি, আর সময় নষ্ট না করে  সোজা প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ে দুই সাংবাদিক)

সন্দেহঃ আচ্ছা স্যার, আপনি তো ব্রাহ্ম স্যার তাই তো? তাহলে এই গুরুদেব ব্যাপারটা কি স্যার? ব্রাহ্ম সমাজে তো গুরু থাকেন না .. মানে তাই তো জানি আর কি …

রবীন্দ্রনাথ : আহা! এ আবার কেমন কথা।ব্রাহ্ম দের আচার্য হয় না…না কি।আমিও হলুম সেই আচার্য।আর এটা তো আশ্রম…ব্রহ্মচর্য আশ্রম…সেই  বৈদিক যুগের আদলে তা আশ্রম থাকবে আর  গুরুদেব থাকবে না তা কি করে হয় বল।আর আমাদের দেশের মানুষের ধরন ধারণ তো সব জানিসই – একটা অথারিটি না থাকলে কি চলে বল! এতোগুলো বছর পড়বে একটা অথারাইজড্  সার্টিফিকেট না থাকলে হয়?  তারপর আমি হলাম গিয়ে মহর্ষির উত্তরাধিকারী।বাবা যখন মহর্ষি – তখন আমি গুরুদেব… এটাই তো লজিক্যাল। তাই না?

প্রঃ স্যার, আপনি তো নোবেল জয়ী, বিশ্বকবি। তারও আগে এই আপনি বললেন তখনকার সমাজের একটি গন্যমান্য পরিবারের সদস্য আপনি ..আচ্ছা, এই পরিবারের অর্থ, প্রতিপত্তির এরকম সহায়তা না থাকলেও কি আপনি এত বড় কবি হতে পারতেন?

রবীন্দ্রনাথ : তা কই।আমার বাকি দাদা দিদিরা! তারা তো কই কেউ  নোবেল পেলো না।তবে কি জানিস ওরা অনেকেই কিছু কম যেত না।আমার এক দিদি তো সেই কবেই উপন্যাস  লিখেছিলেন।বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ তো বাংলা শর্টহ্যান্ড  বানিয়েছিলেন। আর জ্যোতিদাদা! জাস্ট জিনিয়াস।তবে কি জানিস এতো দিনে বুঝেছি, শুধু জিনিয়াস  হলেই হয় না। বুদ্ধিমানও হওয়া চাই।জমিদারীও করতে হবে আবার কবিতাও লিখতে  হবে। এটা সত্যি খুব অল্প বয়সেই বুঝে গেছিলাম।আর সত্যি বলতে কি বুদ্ধিমান হওয়া কি অপরাধ!

সঃ কিন্তু স্যার, এই আমাদের দেখুন .. চাকরি,  উপার্জনের চিন্তা, ডাল, ভাত জোগানোর কথা  ভাবতে ভাবতেই সাহিত্য, কবিতা সব লুপ্ত হয়েছে  তাই আর কি, মানে ভাবছিলাম …

রবীন্দ্রনাথ : একথা কি পুরো পুরি ঠিক বল।আমারও বিশ্বভারতী বানাতে পথে নামতে হয়েছিল।বৌয়ের গয়নাগাটিও গেছিল।আর ওই যে দেশে দেশে ঘুরেছি কেন? টাকা তুলবো বলে। কম তো বক্তৃতা দিই নি।আর তার বদলেই বিশ্বভারতী’র টাকা এসেছে।নোবেলের টাকাটা হাতে পেয়েই তাই সেই বিশ্বভারতীনালা বানানোর কথাই সবার আগে মনে এসেছে।তবে জমিদারীটা ছিল বলেই খাবারের চিন্তা সত্যি  করতে হয় নি।সত্যি সত্যি এর সব ক্রেডিট আমার ঠাকুরদার।সেই যুগে একলাখ টাকার লাভ! ভাবা যায়!

প্রঃ ও হ্যাঁ আপনাদের তো জমিদারী ছিল ? আপনার বাবামশায় আপনাদের সব ভাইকে ছেড়ে আপনাকেই কেন জমিদারীর দায়িত্ব দিতে গেলেন? না মানে, পড়াশোনা না জানা ছেলেকে বিষয়, আশয়ের দায়িত্ব দেওয়াটা বেশ অদ্ভুত না?

রবীন্দ্রনাথ : হ্যাঁ। এই জমিদারী ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। গরিব চাষীদের থেকে খাজনা আদায় করা বেশ কঠিন কাজ ছিল। একটু ভয়ও পেয়েছিলাম। আগের দাদা’রা কেউ পারলো না। আমি একা পারবো কি ভাবে। বাবামশাই ভুল করলে বকতেনও।তবে কি জানিস এই জমিদার জীবনেই আমি আমাদের আসল দেশকে চিনেছি। গরিব মুসলমান প্রজা আর হিন্দু প্রজাদের মধ্যে যে অশান্তি – সেটা সামলাতে সামলাতেই মাথাটা খুলে গেলো।

সঃ স্যার আপনার বাবামশায় বেশ শক্ত হাতে  জমিদারী সামলাতেন বলে শোনা যায়? সেই কাঙ্গাল  হরিনাথের কথা মনে পড়ে ? যিনি তাঁর গ্রাম্যবার্তায় লিখেছিলেন যে মহর্ষি হওয়ার পর থেকে ওনার  শাসনমাত্রা নাকি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে?অনেকটা সেই আপনার ‘বাবু বলিলেন বুঝেছ  উপেন ..’ এর মত জমিদার নাকি?

রবীন্দ্রনাথ : আহাঃ! আবার ওসব কথা কেন? আমিবলেছিলাম না আমার জীবদ্দশায় এই প্রসঙ্গ যেন নাআলোচিত হয়।আজ মরে গিয়েও যখন ফিরে এসেছি তখন আমি  চলে গেলেই বরং ওই নিয়ে লেবু চটকা চটকি করিস।আর ঠাকুরদা ইংল্যান্ডে মারা যাওয়ার পর, বাড়ির যাঅবস্থা হয়েছিল – বলার কথা নয়।তখন বাবামশাই যদি শক্ত হাতে হালটা না ধরতেন  তাহলে আমরা সবাই একপ্রকার বানের জলেই ভেসে যেতাম।বিশ্বভারতী টারতী সব স্বপ্ন হয়েই থেকে যেত।

প্রঃ আচ্ছা বোঝা গেলো…স্যার আপনার স্ত্রী, মানে  মৃণালিনী ম্যাডামের আগের নাম কি  ভবতারিণী ছিল? মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদেশেই কি স্যার আপনি আপনার স্ত্রীর নাম বদলে ফেললেন? নাকি মা কালীর নাম বলে ব্রাহ্ম বাড়ীর মান খোয়া যাওয়ার ভয়ে? নাকি নামটি অতটা আধুনিক নয় বলে?

রবীন্দ্রনাথ : আসলে বাড়ির একটা রীতি ছিল।আমার বয়স তখন ২৩ কি ২৪ হবে।বাবামশাই-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।আর আমি যে নামটা দিয়েছিলুম সেটা তো মন্দ নয়।পরে ‘স্ত্রীর পত্র’- এও তো মৃণাল নামটা ব্যবহার করেছিলুম।

সঃ কিন্তু আপনার মত লোকের জন্য এ কি উচিত কাজ হয়েছে বলুন তো? ম্যাডামকে কখনো জিজ্ঞেস করেছেন স্যার যে তাঁর পিতৃদত্ত নামটি এভাবে যে  রাতারাতি বিলুপ্ত হল তাতে তাঁর দুঃখ হয়েছে কিনা? আপনার ‘গিন্নি’ গল্প তো আবার অন্য কথা বলে কিনা, নাম পরিবর্তন করে দিলে মনে গভীর আঘাত  পাওয়ার কথা তো আপনিই বলেছেন..

রবীন্দ্রনাথ : শোনো হে, সাহিত্যের সত্য আর বাস্তব জীবনের সত্যের মধ্যে  অনেকটাই তফাৎ থাকে।সাহিত্যের মা আর বাস্তবের মা দুজনেই সমান কাঁদে না। সাহিত্যের মা কে শোক প্রমাণ করতে হয়।তেমন ভাবেই সাহিত্যের সব কথা কি বাস্তব জীবনেরসাথে মিলিয়ে নেওয়া যায় বলো? আর তাকে তো  আদরের আরও একটা নাম দিয়েছিলুম ‘ছুটি’!

প্রঃএই প্রসঙ্গেই আরেকটা প্রশ্ন উঠে আসে আপনি মেয়েদের কিভাবে মূল্যায়ন করেন স্যার যদি একটু  বলেন .. মানে ব্যাপারটা একটু না স্যার এলোমেলো লাগে কেমন যেন আমার।তাসের দেশ নাটকে, একটা গোটা দৃশ্য রেখেছেন  ইস্কাবনী, টেক্কানী আর চিরেতনীর কোমর বেঁধে  ঝগড়ার।মেয়ে মানে কোন্দল প্রিয় এই জিনিসটা কি প্রকট  হচ্ছে না এখানে?

রবীন্দ্রনাথ : আসলে নারী চরিত্রের মূলে আছে  ইডিপাস কমপ্লেক্স। প্রতিযোগিতা।নারীর মধ্যে এক প্রবল আমিত্বের তাড়না আছে।পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সে যেহেতু পুরুষের অধীনতা লাঞ্ছনা স্বীকার করে এসেছে চিরকাল,তাই তার  মধ্যে স্বজাতির সাথে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা  কাজ করে।আমি লেখবার সময় জোর করে তা এড়িয়ে যাই নি।

সঃ হ্যাঁ স্যার, মানে সব নাটকেই না আপনার নারী  চরিত্র গুলি একটু মানে ওই আর কি, মানুষ হিসেবে ঠিক যেন উত্তীর্ণ হয় না।সে আপনি সুদর্শনা বলুন বা শ্যামা, কমলিকা,  প্রকৃতি, নন্দিনী, যেই হোক, চরিত্র হিসেবে  খুব অগভীর।আবার এই আপনিই উপন্যাসে সৃষ্টি করেছেন  বিনোদিনী,সৌদামিনী,সুচরিতা,লাবণ্য,বিমলার মত  ব্যক্তি স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল চরিত্র।এটাই প্রশ্ন জাগে যে কোনটা আপনি?

রবীন্দ্রনাথ : আসলে নাটক আর উপন্যাসের  গঠনগত চরিত্র আলাদা।উপন্যাস যখন লিখেছি তখন সেখানে সেই চরিত্র  গুলো রক্ত মাংসের বাস্তব চরিত্র হিসাবেই চিত্রিত  এবং মনে রাখতে হবে যে একমাত্র ‘যোগাযোগ’এর কুমুদিনী ছাড়া বাকিরা কেউ মা নন,আর কুমুর কাছেওনিজ সন্তানের চাইতে আত্মসম্মান ঢের  বেশি দামি ।কিন্তু, নাটকের চরিত্রগুলো যে প্রতীক বা রূপক  সাংকেতিক। সেই কারণেই আখ্যানের জন্যে নাটকের নারী চরিত্রগুলো একটু অন্য রকম হয়েছে।তবে তারা যে বাস্তব হয় নি,তা বলবো না – কারণ,  লাবণ্য বা সুচরিতাকে বাস্তবে খুঁজে পাওয়া কঠিন  হলেও নন্দিনী বা কমলিকারা কিন্তু আমাদের আশেপাশেই রয়েছে।

 প্রঃ ছিন্নপত্রাবলী তে পড়েছি, আপনি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কে লিখছেন মৃণালিনী ম্যাডামের সেই  চলনবিল এর চড়ুইভাতি নিয়ে যে এর পর থেকে  নারী স্বাধীনতার প্রতি আপনার বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।আবার আপনার স্ত্রীর পত্রের মৃণালকে সংসার ত্যাগ করার মত সাহসী করে তোলেন।এগুলি কি পরস্পর বিরোধী হয়ে যায় না কোথাও?

রবীন্দ্রনাথ : হ্যাঁ। বলেছি।সেদিন ছোটোবৌ-এর উপর খুব রাগ হয়েছিল।তখন সবাই পাগলের মতো ওদের খুঁজছে।আমি দুশ্চিন্তায় মরছি।আর ওদের সে দিকে কোনো ভাবনাই নেই।আরে আমি গুরুদেব হই … বা বিশ্বকবি…যাই হই না কেন। শেষ অবধি মানুষতো নাকি।নিজের বৌ-এর উপর রাগ করলেও দোষ!

 প্রঃ না না স্যার, কি যে বলেন! আপনার নাটকগুলির ব্যাপারে একটু বলবেন..ইয়ে এত শক্ত শক্ত কথা কেন? নাটক তো অভিনয়ের  জন্য, মঞ্চস্থ করার জন্য, সব দর্শক কি সবটা  বুঝবেন? মুক্তধারার চৌকিদারও এইরকম কঠিন  তৎসম ভাষায় কথা বলে?

রবীন্দ্রনাথ : আসলে কি জানো, সেই ছোট্টো বেলা থেকেই ঔপনিষদিক পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছি।বাড়িতে প্রাচ্য পাশ্চাত্য দর্শন একেবারে পাশাপাশি  চর্চা হতো।আর স্কুলে যাই নি বলে, ছোটো থেকে বড়োদের বই পড়তে হয়েছে।এই সব মিশে খুব অল্প বয়স থেকেই আমার মধ্যে  একটা স্বকীয় দার্শনিক চেতনা জেগে উঠেছিল।তার উপরে কবিত্ব।শুধু নাটক না সব কিছুতেই এমনকি চিঠি লিখতে  গিয়েও, আমার এই এই দার্শনিক কবিত্ব শক্তি প্রকাশপেয়েছে।তবে কি জানো, আমায় অনেক নাটক রচনা করতে হয়েছে শান্তিনিকেতনের নাট্যাভিনয়ের জন্য।তাই সব কটা নাটক যে আমার দিক থেকেও খুব  উচ্চমানের এমন ভাবার তো কোনো মানে নেই।আর তার থেকেও বড়ো কথা অনেকে হয়তো আমারনাটক কে বলছে যে তা অভিনয় যোগ্য নয়।আবার অনেকে বারবার আমার নাটক মঞ্চস্থও  করছে। আমার কাছে এই দুটোই ভীষণ স্বাভাবিক।কারণ, যেকোনো সৃষ্টিই সকলের সমান ভাবে ভালোলাগবে, এটা যারা ভাবে তারা আত্ম অহংকারী।আমার সে অহংকার নেই।তাই আমার নাটক গুলোতে যে দর্শন আছে, তা যদি কেউ গ্রহণ করতে পারে তবে সে হয়তো জীবনকে  এক অন্যতর মাত্রায় খুঁজে পাবে।কিন্তু আমার সংলাপ কারও কাছে বানিয়ে বলা কবিতার মতো মনে হতেই পারে – তা বলে বক্তব্যটা তো ছোটো হয়ে যাচ্ছে না। বোঝাতে পারলুম!

 সঃ হ্যাঁ স্যার। সেদিন একটা দেখলাম স্যার.. ফাল্গুনী …নাচ, গান হুড়োহুড়িটা বেশ কিন্তু অন্ধ বাউল যে কি বোঝাতে চাইলেন ঠিক পুরো বুঝলাম না যেন। আমাদের কথা ভেবে আরেকটু সহজ করে বললে ভাল হত না স্যার?

রবীন্দ্রনাথ : আচ্ছা শোনো তবে এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি – আমার ‘সোনার তরী’ কবিতাটা পড়েছো নিশ্চই! ওই কবিতাটা নিয়ে একবার খুব হুলস্থুল  পড়ে গেছিল।দ্বিজেন্দ্রলাল তো অনেক লেখালেখি করেছিল।শেষ মেশ আমি বললুম, ক্যালেন্ডার মিলিয়ে কবিতা পড়ে কি হবে। যে যেমন করে পড়ছে পড়ুক না।কেউ যদি তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে চায় ভাবুক আবার কেউ যদি বর্ষার আনন্দ টুকু নিয়ে ভাবতে চায় তো ভাবুক!কোনোটাই ছোটো নয় আমার কাছে।ঠিক তেমন ‘ফাল্গুনী’তেও – কেউ যদি বসন্তের  মজাটুকু নিতে চায় নিক – আর কেউ যদি বসন্তের  তত্ত্ব বুঝতে চায় বুঝুক।আসলে কি জানো, আমাদের সাহিত্য তত্ত্বে একটা  মত আছে এই যে, কোনো স্রষ্টা যে মুহূর্তে তার সৃষ্টি শেষ করে তখন সেটা আর তার একার থাকে না।সবার হয়ে যায়। আমার লেখাগুলোও তাই।সবার সেটা নিয়ে নিজের মতো করে ভাবার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।আর আমি বর্নার্ড ‘শ এর মতো নাটকে ঢুকে ঢুকে নাটকের ব্যাখ্যা দিতে চাই নি কখনো।

প্রঃ নাটকের কথাই যখন হল স্যার, তাসের দেশের কথা বলি আবারও… রাজপুত্র চরিত্রটি আমার  দারুন পচ্ছন্দের.. কি স্মার্ট, ঝকঝকে, একদম হিরো স্যার.. ওই তো পরিবর্তনের দূত না স্যার? কি সুন্দর করে সবার মধ্যে, চিন্তাভাবনায় বদল আনল? কিন্তু স্যার একটা কথা বলুন, তাহলে আপনার সৃষ্টির  ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আপনি এত অনমনীয় কেন? কেনএকটা গানের পরিবেশনকেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে  কুক্ষিগত করে রাখার এত প্রচেষ্টা?

রবীন্দ্রনাথ : আচ্ছা।তোমরা আমায় একটা কথা বলো তো! তোমরা তোমাদের সব বন্ধুকেই কি বেস্ট ফ্রেন্ড বলো! নাকি বাবামা দুজনের প্রতি সক্কলের সমান ভালোবাসা থাকে! বা উল্টোটাও যদি ধরো যে, যাদের একাধিক সন্তান থাকে বাবা মা কি তাদের সকলের প্রতি সমান হয়! তেমন ভাবেই আমিও আমার গান নিয়ে খুব দুর্বল।এককালে অনেক দৌড়াদৌড়ি করে কপিরাইটের  টাইম পিরিয়ডটা বাড়িয়েছিলুম।সকলের কাছেই তার সৃষ্টিরা সন্তানের মতো।কিন্তু সব সন্তানকে যেমন বাবা মা রা সমান চোখে  দেখতে পারে না।তেমনই আমি মনে করতুম, আমার সব সৃষ্টি হারিয়ে গেলেও আমার গান থেকে যাবে।একটা ঘটনা বলি শোনো, একবার দীলিপ, ওই  দ্বিজেন্দ্রলালের ছেলে … খুব ভালো গলা, গান বাঁধতোও খুব ভালো।একবার এসে আমার ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ গানটা নিজের মতো করে শোনালো। বেশ ভালো সুর।কিন্তু একবার ভাবো তোমার সন্তানকে তোমার  পাশের বাড়ির লোক যদি তার মতো সাজিয়ে গুজিয়ে আনে সে যতই সুন্দর হোক না কেন – একটু হলেও কি তোমার মনে হবে না যে ও তোমার সন্তান! আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।আরে আমি কি দেবতা নাকি! তোমরা তো দেখি  আমার পূজা’র গান গুলো সব আমায় ভেবে ভেবেই  গাও। ওখানেই দোষ।আমি আমার সব দিয়েছিলুম অনির্দিষ্ট জীবন  দেবতা’র পায়ে আর তোমরা আমাকেই দেবতা  বানিয়েছো।আর তারপর যেই আমার মধ্যে মানুষের লক্ষণ  গুলো প্রকাশ পাচ্ছে অমনি বেঁকে বসছো! এ করলে কি করে হবে। আমায় মানুষ-এর চোখ দিয়ে দেখো।দেখবে কোনো সমস্যা হবে না।ঠাকুর বানিয়ে ফেললেই সব যাবে। ওটা আমার পদবীই থাক।

সঃ কিন্তু পরীক্ষা নিরীক্ষা তো আপনিও করেছেন? অন্য প্রদেশের গান, বিশ্বের নানা কোনের সুর, গান, ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত, রাগ, টপ্পা, কীর্তন ভেঙ্গে কি  অসাধারণ সব গান করেছেন, কি অপূর্ব সুর সৃষ্টি  হয়েছে তাহলে আপনার নিজের গান নিয়ে এত ভয় কেন স্যার? কেন এত বেঁধে রাখা তাকে?

রবীন্দ্রনাথ : পরীক্ষা করুক না।কিন্তু জেনে পরীক্ষা কতজন করে।আমি মিশ্রণ ঘটিয়েছি … কিন্তু সেখানে ভৈরবী কিন্তু পুরবী হয়ে যায়নি।বা খেয়ালটাকে ধ্রুপদ করে দিইনি।জেনে পরীক্ষা নিরীক্ষা করুক। আমার আপত্তি নেই।কিন্তু কি জানোতো যদি আমি সব ছেড়ে দিয়ে যেতুমদেখতেই তো পাচ্ছো, আমার সময়ের কত গীতিকার সুরকার কোথায় হারিয়ে গেছে।হয়তো আমিও হারিয়ে যেতুম।বা যতটুকু থাকতুম, তার মধ্যে আমার কাজটুকু  হয়তো সিকিভাগে নেমে দাঁড়াতো।সেই জন্যই দরকার একটা প্রতিষ্ঠান।এটাও আমি বুঝেছিলাম।

প্রঃ প্রতিষ্ঠানের কথাই যখন উঠল, বলি স্যার, এই যে আপনি স্কুলে গেলেন না, তথাকথিত পড়াশোনা আপনার ভাল লাগেনি কখনো.. সেই জন্যই প্রকৃতিরকোলে, গাছের ছায়ায় গড়ে তুললেন আপনার স্কুল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিরুদ্ধে আপনার জবাব..শান্তিনিকেতন।কিন্তু তারপর কি হল স্যার? সেই তো একই ধারা,  একই শিক্ষানীতিতেই জড়িয়ে পড়ল শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী…

রবীন্দ্রনাথ : আমি প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধাচরণ  করি নি।আমি বৈদেশিক শিক্ষানীতির বিপক্ষে ছিলাম।আর যেখানে আমাদের ভারতেও নিজস্ব শিক্ষা  পদ্ধতি ছিল। তবে হ্যাঁ। একথা সত্যি।যে স্বপ্ন আমি দেখেছিলুম। তা পূর্ণ হয় নি।কেন জানো।আমার ‘স্বদেশী সমাজ’ পড়লে বুঝতে পারবে।আমার একটাই কথা ছিল, স্বাধীনতার আগে দরকারস্বনির্ভরতা। আমরা উল্টোটা করেছি।তাতে যা হয় তাই’ই হয়েছে।

সঃ স্যার বিশ্বভারতী কিন্তু শুধু দেশ নয়, আক্ষরিক অর্থেই গোটা বিশ্বের সঙ্গীত শিক্ষার পীঠস্থান হয়ে  উঠতে পারত।কিন্তু ওই..আপনার গোঁড়ামি… এই রে সরি স্যার.. আসলে বলছিলাম যে এখনও যে সবরকম গান,  বাদ্যযন্ত্র, সব ধরনের নাচ –এদের প্রবেশাধিকারই  নেই,তা নিয়ে চর্চা, শিক্ষা, গবেষণা তো অনেক দুরের ব্যাপার।মনে হয় না এতে ছাত্র ছাত্রীরা কোথাও বঞ্চিত থেকেযাচ্ছে, শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকছে? যেখানে মন্দিরার  ওপর পি.এইচ.ডি. হয়, সেখানে সরোদের মত শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রের স্থান হয় না?

রবীন্দ্রনাথ : আমার গোঁড়ামি! আচ্ছা তবে তাই।কিন্তু যে বিষয়গুলিকে আমি বিশ্বভারতীতে  এনেছিলাম, সেগুলি ছিল ভারতের নিজস্ব।আর সুপ্রাচীনও বটে।যেগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোকে রক্ষা করাই  ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।এখন পাড়ায় পাড়ায় ভারতনাট্যম বা ওডিসির স্কুল।কিন্তু মণিপুরী বা কথাকলি? দেখতে পাও?  হাতে  গোনা।এই যে এস্রাজ! আগে কোথায় ছিল! নর্তকীদের  মজলিসেই সীমাবদ্ধ।আর সুদূর পাঞ্জাবে শিখ ভজনের সাথে।রাজস্থানেও কিছু কিছু লোকগানে এই এস্রাজই কিছুটা অন্যতর রূপে ব্যবহৃত হতো।আর এখন সেটা সিনেমার গানেও ব্যবহৃত হচ্ছে।আমি এটাই চেয়েছিলুম।আসলো কোনো বিষয়কে জনপ্রিয় করে তোলার  জন্য একটু পৃষ্ঠপোষকতার দরকার পড়ে। আমি সেটাই চেষ্টা করেছিলুম।

 সঃ এই যে আপনার নিজেকে নিয়ে এত ছুঁৎমার্গ  স্যার.. আপনার গান কে সিনেমায় ব্যবহার করতে  দিতেও একসময় আপত্তি করেছিলেন আপনি..আজআপনার জাতীয় সঙ্গীত ব্যবহৃত হয় সিনেমা হলে  প্রতি শোয়ের আগে সেটা জানেন স্যার? আর নাম? এখানে ঢোকার আগে একটু খিদে পেয়েছিল স্যার, যে দোকানটায় চা আর শিঙ্গারা খেলাম স্যার, কি যে ভালো স্যার কি বলব, আপনার সাথে দেখা হবে  জানলে নিয়ে আসতাম ঠিক, তা দোকানটির নাম কিবলুন তো? কবিগুরু চপ সেন্টার.. তাহলে? কি  বলবেন স্যার? নামের বাণিজ্যিকরন নয়?

রবীন্দ্রনাথ : (স্বভাব বিরুদ্ধ প্রচন্ড জোর হাসি হেসে) আচ্ছা! তোমরা ‘ঘুণপোকা’ পড়েছো!  খুব ছোটো উপন্যাস।আমার থেকে অনেক ছোটো শীর্ষেন্দুর লেখা।ওতে আছে একজন রোজ অফিস থেকে ফিরে  আমার ছবিতে ধূপ দেখায়। জল বাতাসা দেয়। হ্যাঁ।মানুষ পুজোর আমি ঘোরতর বিরোধী।আমি কখনও চাইও নি আমায় কেউ পুজো করুক।আসলে কি জানো আমরা যারা বাঙালি আমাদের  মধ্যেই এই মানুষ পুজো করার  একটা ব্যাপার আছেই।সেই কবেকার কবি জয়দেব এই শান্তিনিকেতনের  কাছেই কেন্দুলিতে তাঁর মন্দির আছে।তারপর শ্রীচৈতন্য।তাঁকেও দেবতা বানিয়ে দিয়েছি আমরা।আর রামকৃষ্ণ দেব, সারদা দেবী,  এমনকি নরেন্দ্রনাথকেও আমারা ছাড়িনি।ব্রাহ্মরাও কম যায় না।আদি ব্রাহ্ম সমাজে নিয়ম ছিল ব্রাহ্মণ না হলে  আচার্য হওয়া যেতো না।আর সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজেও অনেক কাল আগে  একটা পাথরের বেদী ছিল।মানুষ সেটাকেই পুজো শুরু করেছিল প্রায়।তাই পরে ভেঙে দেওয়া হলো।বাঙালির এই রোগ ছিল আছে থাকবে। তবে হ্যাঁ।আমি আমি আমার কথা বলতে পারি যে, আমি কিন্তুচাই নি।এমনকি আমি কলকাতায় মারা যেতেও চাই নি।কারণ আমি জানতাম আমি কলকাতায় মারা গেলে।ওরা আমাকে দেবতা বানিয়ে ছাড়বে।কিন্তু সে ইচ্ছা কি আমার থাকলো! বলো! ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী জয় ‘ বলতে বলতে আমায়  ওরা টেনে নিয়ে গেলো।ঠাকুর ভাসানের সময় যেমন পুজোর ফুল, ঠাকুরের গায়ের গয়নার রাংতা বা জরি চুমকি খুলে রাখে, তেমন করেই চুল দাঁড়ি ছিঁড়ে নিয়ে ছিল।তোমরাই বলো, আমি কি ওদের বলে ছিলাম ওরকমকরতে?

প্রঃ আচ্ছা গুরুদেব, আপনি কি কুসংস্কারি? ভূত  প্রেত বেহ্মদত্যি এসব তো সেই ছেলেবেলা থেকেই  বিশ্বাস করে এসেছেন, বড় হয়েও কি করতেন স্যার?প্ল্যানচেট করতেন…আপনার ছেলে রথীর বিয়ে নাকি আপনি প্ল্যানচেটেইঠিক করেছেন? আপনি তো জ্যোতিষও মানতেন  বোধহয় তাই না স্যার? ঠিক বলিনি?

রবীন্দ্রনাথ : ভূত মানলে যদি কেউ কুসংস্কারি হয়ে যায় তবে তো, সবার আগে বাড়ির বাচ্চাদের  রূপকথার গল্প বা ভূতের গল্প বলা বন্ধ করতে হবে।এমনকি রামায়ণ মহাভারতটাও শোনানো যাবে না।আর প্ল্যানচেট করার রীতি বহু যুগ ধরেই আছে।আর একটা কথা  বলি আমি যেহেতু ব্রাহ্ম, অপৌত্তোলিক।তাই শ্রীচৈতন্য বা গৌতম বুদ্ধর বা যীশু খ্রীষ্টের আদর্শদর্শন আমার গ্রহণ করা উচিৎ নয়।কি বলো? জ্যোতিষ মানা বা না মানাটাও তাই।তোমার বাবা বা মা’য়ের সব আচরণ কি তোমার ঠিক মনে হয় বা তোমার প্রিয় বন্ধু বা  ভালোবাসার মানুষটার সব কিছু একেবারে  পারফেক্ট? আরে আমারও তাই।তোমার নিমবেগুন খেতে ভালো লাগে না বলে  আমারও ভালো লাগবে না কেমন করে হবে।আমরা সবাই তো আলাদা।তাই আমাদের মনের বিশ্বাসগুলোও আলাদা।

সঃ আরেকটা প্রশ্ন ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি স্যার?  নতুন বৌঠান কি আপনার কারণেই এরকম অকালে চলে গেছিলেন? এই প্ল্যানচেটে তো আপনি তাঁর  সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বোধহয় না?

রবীন্দ্রনাথ : নতুন বৌঠান! (দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়লো) দেখো কি মজার ব্যাপার  আমি বুড়ো হয়ে মরলুম।আর ও কেমন সুন্দর যুবতী হয়েই থেকে গেল।বয়স আর বাড়লো না।(নীরবতা) ওকে বাঁচাতে পারলুম না।তখন কেমন সব গোলমাল হয়ে গেছিল। হঠাৎ করেই মেজবৌঠান আমার বিয়ের ব্যবস্থা করেফেললেন। বিয়েও হয়ে গেলো।এদিকে ইরা সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা গেলো।নতুনদাও তখন কেমন যেন হয়ে গেছিলেন! জানি  একজন বন্ধু হিসাবে তখন নতুন বৌঠানের পাশে  থাকাটা আমার উচিৎ ছিল।কিন্তু ভাগ্য আর নিয়তি আমায় ভুলিয়ে রেখেছিল।এই কারণে বারবার তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছি।বারবার। আজও চাই। যাক ছাড়ো ওসব কথা।

প্রঃ স্যার.. আপনি বাবা হিসেবে কেমন স্যার?  বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক,  প্রতিবাদের বলিষ্ঠ স্বর আপনি,  নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন ১১-১২ বছর  বয়সে! এমনকি, ওই নিন্দুকেরা বলে স্যার আর কি,  আপনার ছেলের জীবনটিও সুখী হল না আপনার খেয়ালের দোষেই?

রবীন্দ্রনাথ (চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠলো) জানো! যখন বেলা রোগ শয্যায়।রোজ ওকে দেখতে যাই, শরৎ আমার সাথে কথা  পর্যন্ত বলতো না। বৌমা খুব ভালো ছিল।ছোটো ছেলেটাকেও বাঁচাতে পাড়লাম না।আর আমার রানী মা, বড্ড অভিমান করে চলে  গেলো। মীরার ক্ষেত্রেও বুঝতে পারি নি জানো।সত্যি আমি বুঝি না। ভুল করেছি। ভীষণ ভুল।ছোটোবৌ থাকলে বোধহয় সব ঠিক করে দিতো।ও’ও যে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল।কি ভীষণ একা তখন আমি। পারলাম না।

সঃ সব শেষে, স্যার, জন্মদিন উদযাপনের গান তো দিয়ে গেছেন.. বাইশে শ্রাবণ নিয়ে কিছু বলবেন?  সেটিও যে বড় বেশী প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে যেতে বসেছে..আপনাকে আর কেউ আজকাল নীরবে, নিভৃতে মনেকরতে পারে না.. বড় বেশী অনুষ্ঠানের আর আয়োজকের কবি হয়ে গেছেন আপনি যেন…

রবীন্দ্রনাথ : না কই।মৃত্যু দিনের গানও আমি শৈলজা কে  দিয়ে গেছিলুম।প্রথমে গানটা লিখি ‘ডাকঘরে’র জন্যে, পরে মত  পাল্টে বলে দি ওটাই হবে আমার মৃত্যু পথ যাত্রার  গান – ‘সম্মুখে শান্তি পারাবার’।আর যে দেশে স্বদেশীর নাম করে গরিবদের উপর  অত্যাচার হয়েছে, আমার মরদেহ থেকে চুল দাঁড়ি  টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে, সেই দেশে আজ হঠাৎ করে  হুজুগ সব বন্ধ হয়ে যাবে এ আমি আশাও করি না।বরং আজ মানুষ যে ভীষণ আধুনিকতার শিকার,  তাতে করে একা হতে হতে এই হুজুগগুলোই তো তারএকমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাই এ হুজুগ বন্ধ করা সহজ নয়।তবে তোমরা আর যাই করো  আমায় পুজো কোরো না।আমি কোনো মহাকবিও নই বা মহাকাব্যের নায়ক বাখলনায়কও নই, যে তোমরা আমায় পুজো করবে।আমি একজন কবি। এর বেশি কিচ্ছু না।যদি পারো, যদি মনে হয় আমি আমার রচনায় যা  বলেছি, সে সব তোমরা মানো, তবেই সেই আদর্শটাকে প্রসারিত করো।আমি একটুও বিনয় না করেই বলছি।আমি দেবতা হতে চাই না।আমায় মানুষ হয়েই থাকতে দাও। দোষ, গুণ, ভুল, ঠিক, ভালো, মন্দ মেশানো একজন মানুষ। দেবতা বানিয়ে তারপর অপমান করার চাইতে, মানুষভেবে সমালোচনা করো। পারলে তোমাদের মনে ঠাঁই দিয়ো, বেদীতে নয়। এইবার আমাকে ছুটি দাও তো, এসেছিলাম বিশ্রাম নিতে বকিয়ে মারলে… এবার এসো দুজন …

‘সারাদিন কোনও পাত্তাই নেই যে বাবুদের! বরখাস্ত করার চিঠি কি বানিয়ে রাখব দুজনের?’ চিরকুমারের বাজখাঁই গলা ফোনের ভিতর থেকে পারলে বধ করতে চায় প্রশ্ন আর সন্দেহকে। বোলপুর স্টেশনে বসে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল দুজনেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ? সত্যি দেখা হল তাঁর সাথে না স্বপ্নেই ধরা দিয়েছিলেন? দুজনেরই একই স্বপ্ন? কিছুই না বুঝতে পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া দুই বন্ধু এগোল ট্রেনের দিকে.. মাইকে বাজছে ‘বাহিরে ভুল ভাঙবে যখন…’

Published inEditorial

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: