Skip to content

বাংলার নদী-মাঠ-ভাঁটফুলের গল্প – সম্পাদকীয়

এই না শ্রাবণ মাসে ওইনা বিষ্টি আসে – কেমন করে থাকবো বলো আঁধার ঘেরা ঘরে, ভেসে গেল বেহুলা লখাই কালনাগিনীর তরে৷  বিষহরী মা মনসা ডাকি করজোড়ে।


শ্রাবণ মাস, বাংলার ঝড়জলের মাস। এই শ্রাবণ-ভাদ্রেই বাংলার একেবারে নিজের লোকগাঁথা মনসামঙ্গলেরও মাস। সেই লোকগাথায় মিশে আছে এই বাংলা দেশের চিরকালীন সুখদুঃখের কাহিনী। আছে, স্বামীহারা এক স্ত্রীর বিচার পাওয়ার কাহিনী। আছে, এক অবহেলিতা মাতৃ-পিতৃস্নেহে বঞ্চিতা মেয়ের দেবী হয়ে ওঠার গল্প। 


মনসা। শিবের মানসকন্যা। কিন্তু, শিবের অগোচরেই জন্ম হয় তাঁর। সেই কারণে দৈবী শক্তির অধিকারী হয়েও, ‘দেবী’ হয়ে ওঠা হয়না। পিতার ওপর চরম অভিমান, আর বিমাতা দুর্গার তাচ্ছিল্য বিদ্রোহিনী করে তোলে তাকে। তার ওপর সমাজের নিয়ম। চাঁদ সদাগরের স্বীকৃতি পেলে তবেই সে সাধারণ মানুষের পূজা পাওয়ার অধিকারী হবে। ওপর ওপর দেখতে গেলে নেহাতই গল্প, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখতে গেলে মধ্যযুগীয় বাংলার এক স্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে। 
সমাজে অর্থনৈতিক ক্ষমতা যাদের হাতে, তাদের স্বীকৃতি না পেলে দেবী হয়ে ওঠা হয় না স্বয়ং শিবকন্যার। একই ভাবে মধ্যযুগীয় বাংলায় দেখা যাচ্ছে, বণিক সমাজের একছত্র আধিপত্য। আমাদের ঘরে ঘরের লক্ষ্মীর পাঁচলিতেও দেখি, স্বয়ং শ্রীলক্ষ্মী, যাঁর আলাদা করে দৈবিক কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তাঁকেও অবন্তীনগরের ধনপতির গৃহে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়েছিল। অনেকটা তাঁর সৎবোন মনসার মতোই। 
অদ্ভুতভাবে, মনসার গল্প যত এগোয়, তত সেটা মনসার দৈবী শক্তি প্রমাণের গল্পের থেকে হয়ে ওঠে আরেক নারীর গল্প। বেহুলার গল্প। স্বর্গ থেকে অভিশপ্ত ঊষা জন্ম নেয় বেহুলা হয়ে, তার বিবাহ হয় আরেক অভিশপ্ত গন্ধর্ব অনিরুদ্ধ তথা লখিন্দর এর সাথে। ফুলশয্যার রাতেই মনসার চক্রান্তে মারা যায় লখিন্দর। কারণ সে চাঁদ সদাগরের ছেলে। বেহুলা তার স্বামীর সাথে কলার ভেলায় স্বর্গযাত্রা করে। 


এই বিষহরির পূজাই দেবী মনসা পূজা। বাংলার রাঢ়ভূমি হলো সর্পক্ষেত্র, বলা চলে বিষধর সাপের আঁতুড়ঘর৷ বাংলার ঘরে ঘরে তাই নানা লোকাচার পালিত হয় এই সর্পদেবীকে কেন্দ্র করে। বিশেষতঃ দক্ষিণবঙ্গে সাপের উৎপাত বেশি আর তাই লোকাচারও বেশি। দক্ষিণবঙ্গের প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে মনসার থান রয়েছে। সেখানে নিয়মিত মনসার পূজা হয়। আবার অনেক বাড়িতেও তুলসী মঞ্চের পাশে একটা মনসার ডাল পোঁতা থাকে। সেই মনসার গাছেও দেবী মনসা অধিষ্ঠান করেন বলে বিশ্বাস করেন গ্রামবাসীরা। এই মনসার থানে সার্বজনীন ভাবে যে সমস্ত বার-ব্রত ও উপবাসের রীতি রয়েছে তার মধ্যে জৈষ্ঠ্যর শুক্লা-দশমীতে অনুষ্ঠিত মনসা পূজার ব্রত অন্যতম। গ্রামবাসীরা মনে করেন সর্প কূলের আরাধ‍্য দেবী এই ব্রতে সন্তুষ্ট হন। আষাঢ় ও শ্রাবনের অপর্যাপ্ত বৃষ্টিতে যেমন শস্যের ক্ষতি হয় ঠিক একইভাবে এই অপর্যাপ্ত বৃষ্টিতে বিষধর সাপের উৎপাতে মানুষ অতিষ্ট হয়ে ওঠে। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতেও মাঠ-ঘাট ভরে গেলে একই পরিণতি ঘটে। তাই বিষধর সমস্ত সাপের কামড়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই বিষহরির এই পূজার প্রচলন হয়েছিল গ্রামবাংলায়। বাংলায় মনসা পুজো উপলক্ষে ‘সয়লা’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। পদ্মপুরাণ বা মনসা মঙ্গলকে পালাগানে পরিণত করে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়।


এছাড়াও আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার পরের পঞ্চমী তিথিতে নাগপঞ্চমী পালিত হয় বাংলার গ্রামে গ্রামে। এইদিন গ্রামবাসীরা তাদের বাড়ির দালানে সিজগাছ স্থাপন করে মনসার পূজা করেন। এই পুজো করবার রীতি রয়েছে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এই পুরো এক মাস যাবৎ বিষহরির পূজা চলে।


এছাড়াও বহু অঞ্চলে ঘটে বা সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপিতে মনসার পূজা হয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, ত্রিপুরা এবং দক্ষিণ আসামের শিলচর, কাছাড় ও করিমগঞ্জ অঞ্চলে মনসার ঘট তৈরি করা হয়। আসামে জনপ্রিয় পূজাগুলির মধ্যে মনসাপূজা অন্যতম। ওজা-পালি নামে একধরনের সংগীতবহুল যাত্রাপালা সম্পূর্ণভাবে দেবী মনসা কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আসামে।


উত্তরবঙ্গে রাজবংশী জাতির মধ্যে মনসার জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেখানকার আঞ্চলিক কৃষকদের ঘরে ঘরে মনসার থান লক্ষণীয়। এছাড়াও বাংলদেশের নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে মনসাপূজার বিশেষ প্রচলন রয়েছে। বরিশালের এলাকা বিশেষতঃ খাল-বিলে পরিপূর্ণ। এখানকার আবহাওয়া আর্দ্রতার মাত্রা বেশি এবং মাটিও স্যাঁতসেঁতে। যার ফলে এই অঞ্চলে সাপের প্রকোপও খুব বেশী। যদিও লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাবো যে এই বিস্তৃত নিম্মাঞ্চল একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। সেই কারণেই বিষধর সর্পকূলের বসবাস এইজায়গায়। এই কারণ বসতই দেবী মনসা এইস্থানে লোকমধ্যে জনপ্রিয়। এই কারণেই বরিশালের ‘রয়ানি’ গানেরও প্রচলন রয়েছে। ‘রয়ানি’ কথাটা এসেছে রজনী শব্দ থেকে৷ পূর্ববাংলার মানুষের সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রাতের দিকে এই পালাগান শুনতে যেতেন এবং সম্ভবত এই কারণেই এই লোকায়ত সঙ্গীতের নাম হয় রয়ানি৷ বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে মনসাকে আজও রয়হানি নামে ডাকা হয় এবং এই সূত্র ধরেই মনসার পালাগান রয়ানি গান নামে পরিচিত হয়ে ওঠে৷ তবে সাপে কামড়ানোর ভয়ের পাশাপাশি মানুষ ধন-ঐশ্বর্য্য ও সন্তানকামনায়ও দেবী মনসার পূজা করেন।


“কালকেউটের ফণায় নাচছে লখিন্দরের স্মৃতিবেহুলা কখনো বিধবা হয়না, এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় বেলা এবেলা ওবেলা একই শবদেহ নিয়ে, আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্বি দিয়ে। “


যায় ভেসে যায় বেহুলার নাও.. 


পিতৃতান্ত্রিক আর্যসভ্যতার বিরুদ্ধে মনসামঙ্গল এক করুণ বিদ্রোহ। মনসার যুদ্ধ কেবল তার দেবীত্ব প্রমাণের যুদ্ধ নয়, এক শ্রেণীসংগ্রাম ও বটে। নাগ-জাতি অর্থাৎ কোনো এক অন্তজ জাতির সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম। সমাজে যারা ক্ষমতাবান, তাদের বিরুদ্ধে দুই নারীর যুদ্ধঘোষণা। 

বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল, বাংলার খাল বিল, বেহুলার এই অনন্ত যাত্রার সঙ্গী হয়ে ওঠে। বেহুলা হয়ে ওঠে এই দুখিনী বাংলার চিরকালীন প্রতীক। ভালোবাসা ধৈর্য এবং শেষ পর্যন্ত হার না মানার প্রতীক। বাংলায় রচিত হয় এক নতুন রামায়ণ, যার মূল দুই চরিত্র মনসা ও বেহুলা। এখানে স্বামীর জীবন ফেরাতে স্ত্রী যুদ্ধ করে। স্বামীর জীবন ফেরাতে স্ত্রী সশরীরে স্বর্গে যাত্রা করে।
এই জন্মজন্মান্তরের প্রেম নিয়েই কবিরা গীতিকারেরা বার বার গান লিখে গেছেন, সত্যিই গাঙ্গুর হয়েছে কখনও কাবেরী কখনও বা মিসিসিপি, কখনও রাইন কখনও কঙ্গো, নদীদের স্বরলিপি… এই মনসামঙ্গল সেই মুখে মুখে ফেরা মানুষের গান। মানুষের চিরকালীন চাওয়াপাওয়ার গল্প। জাতিস্মর হয়ে ভালোবাসার গল্প। 

গান: কবীর সুমন
শিরোনাম: জীবনানন্দ দাশ  প্রচ্ছদ: যামিনী রায়

Copyright © Kothabriksha 2020, All Rights Reserved

Published inEditorial

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: