Skip to content

একটি রাতের জার্নি – অচিন্ত্য প্রান্তর

সন্ধ্যে ৭:৩০ টার ট্রেন। রেলের হুইসেলের আওয়াজ আর যাত্রীদের তাড়াহুড়োয় সম্বিত ফিরল রেশমির। বেশ তাড়াতাড়িই পৌঁছে দিয়েছে ভ্যানটা। ভ্যানরিক্সাটা থামতেই ওকে নামতে না দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ব্যাগপত্র চাপিয়ে লোকজন বসতে শুরু করেছে। ওদিকে আসার সময় লোকই জোটে না। দুটো ভারী ব্যাগ নিয়ে কতক্ষণ ঠায় স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকে শেষমেশ ট্রেন ছুটে যাবে বলে তাড়া লাগিয়ে ভ্যানটাকে নিয়ে এসেছে। “আস্তে বাপু আস্তে। চোখের মাথা খেয়েছ নাকি..! তোমাদের না নিয়ে তো আর ভ্যান চলে যাবে না”। বিরক্তির স্বরে ঝাঁঝিয়ে উঠল ও। ব্যাগদুটো নামিয়ে বুকের ভেতরটা থেকে পার্শ বের করে ভাড়াটা বাড়িয়ে দিল। “এতে হবে না দিদি, আরও কুড়িটা টাকা দেন, এতটা রাস্তা আপনেরে একা নিয়ে এলাম”…

“ছ’টাকা ভাড়া তো, ষোলো টাকা দিলাম যে, আমাদের থেকেও লাভ করবে বাবু? এই তো এতজন লোককে নিয়ে যাবে, ওটুকু ভাড়া ঠিক উসুল হয়ে যাবে” বলে শরীরটাকে একটু বেঁকিয়ে ভ্যান চালকের মাথায় হাত ছোঁয়ালো রেশমি। “বাল-বাচ্চা নিয়ে ভালো থাকো গো, ভরভরন্ত সংসার হোক”।

“আর কোথায় দিদি…! এই ভ্যান্ চালিয়ে কটা টাকাই বা রোজগার হয়। আশিব্বাদ করেন বাচ্চাগুলাকে যেন মানুষ করতে পারি। আচ্ছা যা দেবেন দেন। আপনের কাছে একটা কয়েন হবে?” রেশমি ব্যাগ থেকে এক টাকার একটা কয়েন বের করে কপালে ছুঁইয়ে ওকে দিল।

আগে এসবে বেশ অবাক হত রেশমি। কিন্তু বিজলির সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে আর হয় না। বিজলির সাথে রেশমির আলাপটাও বড় অদ্ভুতভাবে হয়েছিল। একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় ট্রেনে কটা চ্যাংড়া ছেলে ওকে খুব টিটকিরি করছিল। তখনও ততটা মুখ খুলতে শেখেনি ও। কোথা থেকে শুনতে পেয়ে বিজলি এসে সবকটাকে এমন ধাতানি দিল যে পরের স্টেশন আসা না অবধি বাইরের আকাশ, ধানক্ষেতের সৌন্দর্য্য দেখে আর কূলই পায়‌না। ট্রেন থামতেই তড়িঘড়ি নেমে অন্য কামরায় চম্পট দিয়েছিল সবকটা। সেই দেখে ওদের হাসি আর থামে‌ না। তখন থেকেই আলাপ। তারপর যেতে আসতে প্রায়ই দেখা-সাক্ষাত হতে হতে আলাপ গড়ায় বন্ধুত্বে। বিজলিকে এভাবে অনেককে আশির্বাদ করে কয়েন দিতে দেখেছে রেশমি। বিজলিই হিজরাদের সম্পর্কে জনমানসে প্রচলিত বিশ্বাস, হিজরা সমাজের বিভিন্ন রীতিনীতির খুঁটিনাটি জানিয়েছে ওকে। কিশোর বয়সেই ওর মেয়েলি স্বভাবের জন্য ওকে ঘর ছাড়া হতে হয়। তারপর থেকে ওর হিজরা ঘরের গুরুই ওর বাপ-মা সব। ট্রেনে ট্রেনে বিজলি যে ছল্লা মাগে, সেখান থেকে আধাআধি ভাগ দিতে হয় গুরুকে। বাকি টাকা থেকে ও অসুস্থ মা’কে বাড়িতে টাকা পাঠায়। ওখান থেকেই মা বোনেদের বিয়ের জন্যেও টাকা জমাচ্ছে। ভাই বিয়ে করে বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। এখন রোজ এসে বাড়ির ভাগ নিয়ে অশান্তি করছে মা’র সাথে, গায়ে হাতও তোলে। বিজলির ইচ্ছে করে মেরে ওর ভাইয়ের হাত-পা ভেঙে দিতে। কতদিন বাড়িতে গিয়ে ওকে শিক্ষা দিতে চেয়েছে। কিন্তু, মা চায় না ও বাড়ি যাক। বোনেদের বিয়ে দিতে অসুবিধে হবে তাতে। বিজলি মাঝে মাঝে দুঃখ করে রেশমিকে বলে সেসব কথা। কলেজ থেকে ফেরার সময় রেশমি অটো ভাড়া বাঁচিয়ে কখনও চা-বিস্কুট কখনও কেক খাওয়ায় বিজলিকে। বিজলি জোর করলেও কিছুতেই দাম দিতে দেয় না ওকে। একদিন বিজলিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আচ্ছা তুমি সবাইকে এরকম আশির্বাদ করো কেন? আমরা সবাই তো এক। সাধারণ মানুষের তোমাদের সম্পর্কে যে এত ভুল ধারণা, সেগুলো ভাঙো না কেন তোমরা?
– বিজলি চোখ মটকে ছদ্ম কোপ দেখিয়ে বলে, “তোমাদের” সম্পক্কে আবার কি? “আমাদের” সম্পক্কে বল্। তুমি কি ভেবেছো? লোকে তোমায় আমায় আলাদা ভাবে? যতই কলেজে বি.এ, এম.এ পাশ দাও না কেন, ছল্লাওয়ালি, বাঁধাইওয়ালি হিজরার সাথে তোমার কোনো তফাৎ কেউ করবে না। শেষের কথাগুলো ওর হাতের তালির শব্দ ছাপিয়েও রেশমির কানে এসে বেঁধে।

মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে- আমি জানি বিজলি দি। তোমার খারাপ লাগলো? আমি কিন্তু ওভাবে বলতে চাইনি।

বিজলি সশব্দে হেসে বলে, সে আর তোকে বলতে হবে না পাগলি। এত লোক চড়িয়ে পয়সা তুলি। কথার ভেতরের মানেটুকু বুঝতে আমার অসুবিধে হয় না। তবে সত্যি-মিথ্যে জানি নে রে। ঈশ্বর আমাদের কোনো বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েচে কিনা তাও জানি না। তবে এটুকু জানি, লোকেদের মনে যদি আমাদের আশিব্বাদ-অভিশাপ নিয়ে ভয়-ভীতিটুকুও চলে যায়, তাহলে আমাদের বাঁচাটাই দায় হয়ে যাবে। আমাদের নিয়ে এই গল্পগুলোই তো আমাদের কিছুটা হলেও নিরাপদে বাঁচিয়ে রেখেছে। পরে অবশ্য নিজের জীবন দিয়েই বিজলির বলা কথাগুলোর সত্যতার প্রমান পেয়েছে রেশমি।

ভ্যানচালকটিও ওকে হিজরাই ভেবেছে। সেটা অবশ্য রেশমির কারণেই। ও ইচ্ছে করেই সে ভুল ভাঙায়নি। একা পথ চলতে গেলে বিজলির মতো এই জাতীয় কিছু বিশেষ অঙ্গভঙ্গির একটা বাহ্যিক আবরণ গায়ে চাপিয়ে নেয় রেশমিও। এতে রাস্তাঘাটে চলতে সুবিধে হয়। অন্যান্য যাত্রীরা ততক্ষণে ভ্যানচালককে তাড়া লাগাতে শুরু করেছে। তাদের দিকে একবার কটাক্ষে চেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পনিটেল করা রুক্ষ চুলের গোছাটা পিঠে ফেলে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগালো রেশমি।

একটু থেমে মোবাইল বের করে সময়টা একবার দেখে নিল। ছ’টা বেজে পনেরো মিনিট। হাতে আরও খানিকটা সময় আছে। হঠাৎ স্টেশন লাগোয়া রিকশা স্ট্যান্ড থেকে সজোরে একটা শিষের শব্দ ভেসে আসে। লক্ষ্য যে ও’ই সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারে। খানিক থমকে যায়। ও পাড়ার রাজু কি? কিন্তু ওর শিষে তো এতটা তীক্ষ্ণতা থাকে না। বিকেলে রেশমি যখন সুইটিদের সাথে কলকল করতে করতে ঝিলের রাস্তাটা ধরে বড় মাঠটায় হাওয়া খেতে যায়, তখন রাজু রিক্সাটা বের করে ঐ রাস্তাটা ধরেই স্ট্যান্ডের দিকে আসে। ঠোঁটের কোনে মুচকি হেসে বড় নরম করে ওর দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে শিষ দিয়ে কোনো একটা হিন্দি গানের সুর ভাজতে ভাজতে ওদের দলটার পাশ দিয়ে রিক্সাটা নিয়ে এগিয়ে যায়। পেরিয়ে গিয়েও চওড়া হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে কয়েকবার ওদের দেখে নেয়। যত দূরে যায় শিষে সুরের ঝোঁকটাকে তত চড়িয়ে সজোরে গাইতে থাকে সদ্য তোলা হিন্দি ছবির নতুন গানের কলি… “কিউকি তুমি হি হো, অব তুমি হি হো…” ওদের ক্রশ করার সময় আড়চোখে তাকিয়ে বিশেষ করে রেশমির মনোযোগ আকর্ষণের জন্যেই যে ও স্পিডে রিক্সাটাকে নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় গোল করে একবার ঘুরে রিক্সার হাতল থেকে দু-হাত তুলে রণবীর সিং স্টাইলে চুল ঠিক করতে করতে বিশেষ কায়দা দেখায়, তা রেশমি বেশ ভালো বুঝতে পারে।

যতবার রাজু এমন করে, ততবার ধুকপুক করতে থাকে ওর বুকের ভেতরটা।। এই তো সেদিন একটা বাইকের সাথে ধাক্কা লাগতে লাগতে লাগেনি। এত কায়দার কি আছে বাপু, কিছু বলার থাকে তো সোজাসুজি বললেই হয়…! শুধু ও কেন? তানিয়া, সুইটি, কাজল সবাই বুঝতে পারে ওস্তাদের এই ওস্তাদি কার উদ্দেশ্যে…। এ নিয়ে প্রচুর রঙ্গ-তামাশা চলে ওদের মধ্যে…। রাজুর রিক্সাটা দৃশ্যমান হলেই ওরা তরল হাসির লহড়ি তুলে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে থাকে। রেশমি তখন মনে মনে সারফারোশ সিনেমায় দেখা কলেজে পাঠরতা সোনালি বেন্দ্রে। রাজুর চোখের ঐ অদ্ভুত নেশাধরা চাউনি আর ঠোঁটের কোনের মিষ্টি হাসিতে ওর অনেকক্ষণ একটা ঘোর মতো লেগে থাকে। গোধূলির কমলা আভায় কৃষ্ণচূড়ার ঝরা ফুলে ভরে থাকা ঝিলপাড়ের রাস্তাটা প্রায়দিনই সাক্ষী থাকে এই আপাত তুচ্ছ ঘটনার….

কিন্তু সেটা তো ওদের একান্ত আদান-প্রদান বলেই ও জানতো। ভরা স্টেশনে সবার মাঝে রাজু কি এমন করবে? চোয়ালটা সামান্য শক্ত হয়ে যায় ওর। তবে কি বাবাইদের গ্ৰুপটা? কদিন ধরে কয়েকটা বন্ধু জুটিয়ে সন্ধ্যের পর রেশমিদের দলটার চারপাশে ঘুরঘুর করছে। রেশমি বিশেষ পাত্তা দেয়নি, তবে সুইটিদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য লক্ষ্য করেছে। ওদের দলে রেশমিই যে আলাদা করে ছেলেদের নজর কাড়ে সেটা ওরা সবাই জানে। এরজন্য অবশ্য ওদের একটা চাপা ঈর্ষাও আছে। কোনো রাখঢাক না রেখেই এক একসময় বলে- “রেশমি দি, তুমি সাথে থাকলে আমাদের আর পারিখ(প্রেমিক) জুটবে না গো। সবাই তো আমাদের ফেলে খালি তোমাকেই দেখে।” রেশমি হো হো করে হেসে উড়িয়ে দেয় বটে। কিন্ত ওর মধ্যে যে আলাদা একটা চটক আছে, সেটা ও বেশ ভালো করেই জানে। বাকিদের মতো এত চড়া মেক-আপও ওর না-পসন্দ। পোশাকও সবসময়ই একটু টাইট কেনে, যাতে মেয়েদের টপের মতো লাগে, আলাদা করে ছেলেদের ড্রেস বলে বোঝা না যায়। মুখটাকে অবাঞ্চিত ঘন রোমরাজি থেকে সবসময় ক্লীন রাখে। কোথাও বেরোনোর আগে শুধু সরু করে কাজল, হাল্কা লিপস্টিক আর একটু পাউডার লাগিয়ে, চুলটা চুড়ো করে বেঁধে, টিপের পাতাটা ব্যাগে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পেসমেকার বসানোর পর থেকে বাবা একেবারেই বাড়িতে বসা। ওনার সামনে দিয়ে এখনও টিপটা পড়ে বেরোতে পারে না। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে চুলটা খুলে দেয়।

বাকি বন্ধুদের মধ্যে ওর চুলই সবচেয়ে বড়। কাঁধ ছাড়িয়ে সবে পিঠ ছুঁয়েছে। অন্যদের মধ্যে একজন-দুজন সবেমাত্র চুল বড় করতে শুরু করেছে। ওদেরটা এখনও ঘাড় ছাড়ায়নি। এই চুল বড় করা নিয়েও সবার বাড়িতে হত হাঙ্গামা..! পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজনের ওজর-আপত্তির শেষ নেই। ওর বাড়িতেও কি কম ঝামেলা হয়েছে…! বাবার হাতে কত মার খেয়েছে এ নিয়ে…! ও বাড়ির জেঠিমা বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতো- “চুলটা এবার কাট না পিন্টু। অস্বস্তি হয় না? এই গরমে আমরাই ঘেমে নেয়ে অস্থির…! এত বড় চুল নিয়ে থাকিস কি করে…!”

সেদিন রেশমি আর থাকতে না পেরে বলেছিল- ” এত অস্বস্তি যখন, তোমার মেয়ের মাথায় চুলগুলোকেও একেবারে ছেঁটে দাও না‌ জেঠি, নিজের মাথাটাকেও কামিয়ে ফেলো”

– ” এ আবার কি কথা…! আমরা তো মেয়ে”

– “মাথাটা আমার, চুল আমার, শরীরও আমার। কি রাখবো আর কি রাখবো না সেটা আমি বুঝে নেব। তোমাদের অত মাথাব্যথা কিসের ?” বলে ঘরে চলে এসেছিল। সেই ছোটো বেলা থেকে কম কিছু তো শুনে বড় হল না, ওর সবকিছুতেই সবার আপত্তি।

“এই গরমেও মোটা জামাটা মেয়েদের মতো গায়ে চড়িয়ে রেখেছিস কেন, খালি গায়ে থাকতে পারিস না? কি ছেলে রে বাবা…! “

“মাগীদের মতো বাথরুমে ঢুকে পেচ্ছাপ করার কি হয়েছে?”,

“বাথরুমে লোক আছে তো, কলপাড়ে গামছা পড়ে চান করে নে। ছেলে হয়ে মেয়েদের মতো রোজ রোজ জামা-কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকার কি আছে?”।

কত বিধিনিষেধের ঠেলা…! একটু বড় হওয়ার পর থেকেই সহজাত লজ্জায় ওপরের কোনো ছেলেসুলভ আচরণই করতে পারেনি ও। যেরকমটা মা-কাকিমাদের চিরকাল করতে দেখে এসেছে, তেমনটাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে।

সেবার চুলটা কতটা বড় হয়েছিল, একদিন মদ খেয়ে এসে ঘুমের মধ্যে বাবা কাঁচি দিয়ে কেটে দিল। রাগে মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল ওর। চারদিন‌ কিছুটি দাঁতে কাটেনি। শেষমেশ ওর জেদের কাছে হার মেনে সকলেই ওকে শোধরানোর চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছেন। মা আর বোন সবটাই বুঝতে পারে, বাবার সামনেই শুধু নিজেকে একটু রেখেঢেকে চলে ও। আজও টপ আর জিন্স পড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। ওদের পাড়ার শেফালী বৌদিদের বাড়ি থেকে সেটা বদলে কুর্তি আর পাতিয়ালা প্যান্ট পরে নিয়েছে। দেখেছেন ওর আসল নামটাই এতক্ষন আপনাদের বলা হয়নি। দাদু নাম রেখেছিলেন রণজিৎ। জন্ম ইস্তক এই নামটিই বার্থ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে ভোটার কার্ডে, প্যান কার্ডে, আধার কার্ডে সর্বত্র বহন করতে বাধ্য হয়েছে ও। তা সেজন্য ওর পরিবারকে কোনো দোষ দেয়না রেশমি। ঈশ্বরই যেখানে ওর দেহটা ছেলের মতো করে গড়ে তাতে একটা মেয়ের মন পুরে দিয়ে ওর সাথে এমন নির্মম রসিকতা করেছেন, সেখানে ইহজগতে আর কার কাছে কি অভিযোগ জানাবে ও?

তাই গোটা শৈশব, কৈশোরটা লজ্জায়, কুন্ঠায়, নিজেকে আপাদমস্তক মিথ্যে খোলসে মুড়ে, সত্যি পরিচয় গোপন করে প্রতিনিয়ত এভাবে মরে মরে বাঁচার চেয়ে সোচ্চারে মাথা উঁচু করে নিজের বাস্তবের কথা জানান দেওয়াই সঠিক বলে মনে হয়েছে ওর। তাতে যা হয় হবে। এমনিতেও তো কম লাঞ্ছনা জুটছে না। এত চাপাচুপি দিয়েও নিজেকে ঢাকতে পারছে কই? ছক্কা, লেডিস, বৌদি , হিজরে এই তকমাগুলোতো সেই শিশুকাল থেকে শরীরে সেঁটে আছে। আর কিসের ভয়? তাছাড়া কোনো অন্যায় তো ও করছে না। জন্মটাই যদি অন্যায় হয়, তবে তার দায়ও ওর নয়। বাঁচতে হলে নিজের সত্ত্বা নিয়েই বাঁচবে আর এর জন্য যদি মরতে হয়, তা হলেও নিজের পরিচয় নিয়েই মরবে। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত গুমরে মরার চেয়ে একবারে মরে যাওয়া বহুগুণে ভালো…!

শিষের আওয়াজটা ক্রমেই তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হচ্ছে। সেটার ধুয়ো ধরে আরো দু-তিনটে মৃদু শিসও যেন কানে আসছে। এই ঘটনাগুলোয় সবসময় একরকম প্রতিক্রিয়া হয় না রেশমির। অনেক সময়ই পুরুষদের এই ইশারা-ইঙ্গিতের মধ্যে দিয়ে ও একটা অদ্ভুত পরিতৃপ্তি খুঁজে পায়। অন্তরের যে সযত্নলালিত নারীমন আর সকলের কাছে অস্বীকৃত, প্রতিমুহূর্তে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে প্রমানযোগ্য, রেশমির এই স্তন-যোনি-ঋতুবিহীন, তাচ্ছিল্যের নারী জীবনে নারীত্বের মর্যাদা এনে দেয় ঐ চোরাগোপ্তা আওয়াজ। হোক অশ্লীল। তবু স্বীকৃতি তো। শরীর-মনে দুকূল ছাপিয়ে যেন তখন আনন্দের প্লাবন আসে। বাড়ির বাইরে বেরোলেই এই উটকো শব্দগুলোর আকাঙ্ক্ষাতে সজাগ, উন্মুখ হয়ে থাকে ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয়। কিন্তু ওটুকুই। টুকটাক কথার বাইরে কাউকে এর চেয়ে বেশি কাছে ঘেঁষতে দেয়না রেশমি। “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” গোছের একটা খেলা এটা ওর কাছে। মনের সহযাত প্রবৃত্তিগুলো যখন অবরুদ্ধ হয়ে অন্তর্মুখী হয়, তখন সেগুলো কোন পথে, কি রূপ নিয়ে প্রকাশ পাবে, তা বলা দুঃসাধ্য।

শিস বাজিয়েদের খেদ আরেকটু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, সালোয়ারটা টেনে, কাঁধে ব্রা’র স্ট্রাপটা উঠিয়ে নকল বক্ষস্থলটা আরেকটু পরিস্ফুট করে শরীরে ঢেউ তুলে চপল গতিতে প্ল্যাটফর্মের দিকে পা বাড়ালো রেশমি। আজ আর তার অজানা আশিকদের ওষ্ঠধ্বনিতে সাড়া দেওয়ার সময় নেই। দূর থেকে ওকে দেখেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

জেনারেল টিকিট কাউন্টারের লাইনে দাঁড়াল রেশমি। গন্তব্য বিহারের আড়া। লাইন খুব একটা লম্বা নয়। কিন্তু লক্ষ্য করল ওর পেছনে ক্রমে লাইন লম্বা হতে শুরু করেছে। ন’জনের পর টিকিট পেল। দু নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ফারাক্কা এক্সপ্রেস ছাড়বে। ডিসপ্লে বোর্ডে একবার দেখে নিয়ে ওভার ব্রিজের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ব্যাগ দুটো বড্ড ভারী। প্রায় মাস তিনেকের জামা-কাপড় আঁট করা তাতে, তারপর লগনের নাচের তিন-চার সেট কস্টিউম, ফলস গয়নাগাটি, মেকআপের সরঞ্জাম, বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার, নিজের একটা থালা-বাটি-গেলাশও নিয়ে নিয়েছে। সবসময়ই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজের সঙ্গে নিয়ে যায় ও। মায়ের মতো বড় পিটপিটে স্বভাবের। অন্যের ব্যাবহার করা জিনিস সহজে ব্যাবহার করতে পারে না। ব্যাগ দুটো দুহাতে টানতে টানতে সিঁড়ি ধাপ পেরোতে লাগলো। ইতিমধ্যে চারপাশের লোক ওর দিকে তাকাতে শুরু করেছে। মুখখানা কঠিন করে নেয় রেশমি।

নাস্তানাবুদ হয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে মাথায় হাত পড়ার যোগার হয় ওর। জেনারেল কামরার বাইরে গাদাগাদি ভিড়কে নিয়ন্ত্রন করে লাইন করার চেষ্টা করছে RPF। সেই লাইন এখনই চোখের নাগাল ছাড়িয়ে গেছে, এত ভারী ব্যাগ নিয়ে এই ঠেলাঠেলির মধ্যে উঠবে কি করে…! তার ওপর পুরো রাতের জার্নি। সকাল সাড়ে-সাতটা নাগাদ আড়ায় পৌঁছয়। লেট করলে তো আর কথাই নেই। ঐ বড় মাপের বাগদুটো বগলদাবা করে বার দুয়েক গোটা প্ল্যাটফর্মটায় চক্কর খেয়ে নিরাশ রয়ে একটা জায়গায় ব্যাগদুটো রেখে তার বসে পড়ল। জেনারেলে তিলধারণেরও জায়গা নেই। এত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিল। আগে থেকে জানা থাকলে কটা টাকা বেশি দিয়ে রিজার্ভেশনই করে নেওয়া যেত। যাই হোক, রিজার্ভেশন কামরাতেই একটা কোনে বলে কয়ে একটু ব্যাবস্থা করতে হবে। আগে হলে এরকম ভাবতেই পারত না, কিন্তু বেশ কয়েকবারের যাতায়াতে এখন এসবে বেশ চোস্ত হয়ে উঠেছে ও। তবে জেনারেল কামরাটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। এত লোকের মাঝে রাতদুপুরে কেউ চাদরের তলা দিয়ে হাত ঢোকাতে সাহস করে না। একবার তো সে কি কান্ড…! রাতে বাথরুমে গেছে, দরজা খুলে বেরোতে যাবে, ওমনি দুটো ছেলে দরজা খুলে ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে এসেছে। অনেকক্ষন ধরেই কাছে ঘেঁসার চেষ্ঠা করছিল, কিন্তু এতটা বাড়তে পারে বলে ও আশা করেনি। শেষমেশ উপস্থিত বুদ্ধির জোরে নিজেকে HIV পজিটিভ বলে রক্ষা পেয়েছে।

সব যাত্রী উঠে যাওয়ার পর কামরায় উঠে এদিক-ওদিক দেখে একটা ফাঁকা সিটে বসল। লোক এলে নাহয় টিটিকে বলে মেঝেতে বা দরজার পাশে একটা কোনে একটু জায়গায় বসে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। মুশকিল হয়েছে এই বড় ব্যাগ দুটোকে নিয়ে, কোথায় যে রাখে…! বার্থগুলো একবার ঘুরে এসেছে। লোকজনের যা মুখভঙ্গি, কোনো অনুরোধ আর করতে পারেনি। ইতিমধ্যে বার ছ’য়েক রাশেদের ফোন এসে গেছে। রেশমা জানে আড়ায় না পৌঁছনো অবধি এই ফোন আসা চলতেই থাকবে। বিরক্তিতে ফোনটা তোলে-” হা রাশেদ ভাই”

-“ট্রেন মে ঠিক সে বৈঠক গেয়ি রেশমা?”

– “আমি তো বলেছিলাম ট্রেন ছাড়লে জানিয়ে দেব। ইতনি বার কিউ ফোন কর রহে হ্যায়?”

– “মেরি পেয়ারি… গুসসা মত হো… তু তো জানতি হ্যায় না, লগন কে ওয়াক্ত, ধান্দার জন্য কত প্রেসার নিতে হয়? শাদি ওয়ালে পার্টিকে ধরো, লন্ডিয়া ব্যাবস্থা কর, তারপরও কত নখরা… চম্পা আখরি মুহূর্তে উ সালেমকে সাথ রফা করে নিল। দু-হাজার বেশী পাচ্ছে ওদের থেকে। নতুন লন্ডিয়াকে নিয়ে কত ঝামেলা হয় তু তো জানিস, সবসময় চোখে চোখে রাখতে হয়। তু না থাকলে হামি ডুবে যেতাম রেশমা।”

খানিকক্ষন চুপ থেকে রেশমা বলল- “আমি সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবো রাশেদ ভাই।”

– “লেকিন এত জার্নি করে তু কাল নাচতে পারবি তো? ওর ইস্ বার গরমি ভি ইতনি তেজ হ্যায়…! “

-” পারতেই হবে রাশেদ ভাই। আপ চিন্তা মত করো।”

– সির্ফ তু হি ইস্ বার ভরসা রেশমি। বাকি নেয়ি লন্ডিও কো ভি তুঝ্কো হি সিখাকে তৈয়ার করনা হ্যায়… ট্রেন মে টিটিও সে বাত করতে দেখনা আগার সিট মিলে তো… পয়সে কা চিন্তা মত করনা। হাম্ দে দেঙ্গে। ঠিক হ্যায়, রাখতে হ্যায় মেরি জান… ফোনটা কেটে দেয় রেশমি।

রাশেদের সাথে বছর ছয়েক হল কাজ করছে রেশমি। বিউটি ওর প্রথম রাশেদের আলাপ করিয়ে দেয়। সেই সময় ও সদ্য গ্ৰ্যাজুয়েশন করে হন্যে হয়ে একটা কাজ খুঁজছে। আর কিছু না পেয়ে টিউশনির পাশাপাশি একটা বাড়িতে হাজার খানেক টাকার বিনিময়ে ঘর মোছা, বাসন মাজার কাজও নিয়েছিল। কিন্তু এভাবে মাস গেলে কটা টাকার বিনিময়ে আর কদ্দিন…! বিউটি তখন লগনে নেচে প্রচুর টাকা কামাচ্ছে। ওপরের টিনের শেড বদলে ছাদ দিল, ফ্রিজ, বড় একটা কালার টি.ভি আনল। সেবার লগন থেকে ফিরে একদিন বাড়িতে ডেকে রেশমিদের অনেক কিছু খাইয়েওছিল। সেদিনটি বিউটিকে রেশমি বলেছিল- “আর এভাবে চলছে না বিউটি দি। কটা মাত্র টাকায় খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে। B.A পাশ করে কি হল বলো? একটা কাজ কেউ দিচ্ছে না।”

“আমাদের কে আর কাজ দেবে বল..! তুই বরং আমার সঙ্গে লগনে চল না? নতুন তো, প্রথম প্রথম সাতশো-আটশো করে পাবি, তারপর ছুট আছে। সব মিলিয়ে পার শাদি দেড়-দু হাজার পেয়ে যাবি। ন-দশটা শাদিতে নাচলেই আঠেরো-কুড়ি হাজার উঠে আসা কোনো ব্যাপারই না। আর আমি আছি তো, কিভাবে ঝলকি তুলতে হয়, সব শিখিয়ে দেব। চোখ মেরে হাতের ইশারায় পয়সার ইঙ্গিত করে ওর গায়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল বিউটি। একবার একটু ইতস্তত করলেও, আর দ্বিতীয়বার ভাবেনি রেশমি। বাড়িতে চাকরি পাওয়ার নাম করে মিথ্যে বলে বিউটির সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল। মা একবার সন্দেহের চোখে দেখেছিল বটে, কিন্তু ছেলে হয়ে আর কতদিন ঘরে বসে থাকবে, কত ছেলেরাই তো বাইরে বেরিয়ে উপার্জন করছে। তাতে যদি মেয়েলি ভাবটাও কাটে… সেইসব ভেবে আর আপত্তি করেনি। তারপর থেকে সেই চলছে…।

রাশেদ ছাড়াও আরও অনেক মালিকের সাথে কাজ করেছে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। কারোর সাথে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকায় গোটা মরশুম রফা হয় আবার কারোর সাথে পার শাদি হিসেবে টাকার রফা হয়। যে যত সুন্দরী আর যত অভিজ্ঞ, তার তত ডিমান্ড। শাদিঘরের পার্টিরা ছবি দেখে তারপর মালিককে অ্যাডভান্স করে দেয়। পরে শাদির দিনে ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে তারপর ফুল পেমেন্ট। নাচের সময় বারাতিরা যে রুপাইয়া ছড়ায়, বুকের চোলিতে, পেটের কাছে ঘাগড়ার মধ্যে যেসব টাকা গুঁজে দেয়, মালিকের সাথে সেসব ছুটেরও আধাআধি বখরা হয়। ওটাই এ পেশায় উপরি রোজগার। বিউটি সাবধান করে দিয়েছিল- চোলির ভেতরে, লেহেঙ্গার চোরা পকেটে বাটোয়ারার আগেই যেন ছুটের কিছুটা টাকা সরিয়ে ফেলে। বোকার মতো ছুটের সব টাকা যেন মালিকের হাতে তুলে না দেয়। এ কাজে ঝামেলা তো কম নয়। বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের ঠা ঠা রোদে সকাল থেকে নাচ শুরু হয়, চলে রাত বারোটা-একটা পর্যন্ত্য। মাথা ঘুরে যায় একেক সময়। তার ওপর দুলহা থেকে শুরু করে তার দাদাজি অবধি এসে নতুন লন্ডার রস নিতে চায়। সাজের ঘর থেকে শুরু হয় পুরুষদের ছোকছোকানি। মদ খেয়ে বারাতিরা নাচের সময় কোলে তুলতে চায়। খামচে ধরে কোমর-পিঠ। আরও কত ঝক্কি..! একবারতো দুটো বেজে যাওয়ার পরেও রেশমিকে কিছুতেই নাচ থামাতে দেবে না। মদ খেয়ে চুর হয়ে বন্দুক তাক করে রেখেছে ওর দিকে। এদিকে খিদেয় মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। এতকিছুতেও মাথা গরম করা চলবে না। তাহলেই মালিকের বদনাম। আর পুরো পেমেন্টও মিলবে না।

এ পেশায় টাকা আছে বটে, কিন্তু এত কিছু সামলে এ ধান্দায় পসার জমানো মুখের কথা নয়। অনেকেই একবার অভিজ্ঞতা হওয়ার পর আর আসতে চায় না। বা প্রয়োজন বিশেষে একটা সিজন করেই টাকা নিয়ে কেটে পড়ে। তাই অনেক মালিকেরা একটা সিজনের পুরো পেমেন্ট না দিয়ে, কিছুটা আটকে রাখে। এভাবে রেশমির কত টাকা মার গেছে…! পরের বার এলে তবে আগের বারের বাকি টাকা পাবে। আবার সেই বারের কিছুটা পেমেন্ট আটকে থাকবে তার পরেরবারের জন্য। এমনটাই দস্তুর। কিন্তু রাসেদ কখনো রেশমির সাথে তেমনটা করেনি। প্রতিবার ওর পুরো পেমেন্ট মিটিয়ে পরেরবার আসার জন্য অনুরোধ করে খালি।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। উঠে এসে একবার দরজার কাছেই পাশে ব্যাগ দুটো রেখে মেঝেতে একটা খবরের কাগজ পেতে পা ছড়িয়ে বসল সে। একে একে মা, রাশেদ ট্রেনে ওঠার খবরটা জানিয়ে একটু হাঁফ ছাড়লো। মালদা শহর ছাড়িয়ে ট্রেনটা অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে। আবার দরজার পাশ থেকে উঠে একটা ফাঁকা সিট দেখে বসল রেশমি। জানলার রডে মাথাটা রেখে ক্লান্ত শরীরটা একটু এলিয়ে দিল। বাইরে আকাশে তখন কাস্তে আকারের চাঁদ আর তারা কটাকে বারেবারে ঢেকে দিচ্ছে ঘন-ধুসর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। ছোটোবলা থেকেই রাত্রি বড় প্রিয় রেশমির। আঁধার নামলেই তার মধ্যে কেমন একটা নিবিড় আশ্রয় খুঁজে পায় ও। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্পনায় বহুদূর মেলে দেওয়া যায় মনটাকে। মনমুকুরে ভেসে ওঠা একটা নিকোনো ঘর, একজন মনের মানুষ, খেটে আসার পর তাকে রেঁধে-বেড়ে খাইয়ে, পাখার বাতাস করে দু-দন্ড মনের কথা বলার সুখের স্বপ্ন, দিনের ফ্যাটফ্যাটে আলো এসে একমুহূর্তে ধুয়ে-মুছে আবরণহীন কঠিন বাস্তবটাকে চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়…।

রেলের ঘটাংঘট শব্দে একের পর এক ভাবনার সুতো জট পাকিয়ে যায় রেশমির মাথায়। সংসারের অভাব সাথে ওর নিজের সংঘর্ষ নিয়ে সবসময় জর্জরিত হয়ে থাকে সে। প্রতিবারই ভাবে এই শেষবার। আর লগনে আসবে না। এত বড় পৃথিবীতে একটা না একটা সম্মানজনক কাজ ঠিক জুটিয়ে ফেলবে। স্থানীয় কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে গ্ৰ্যাজুয়েট ও। কিন্তু নিজের পরিচয় নিয়ে সব জায়গায় হাজার বলে কয়েও একটা কাজ পায় না। ওদিকে সংসারটা মস্ত হাঁ করে বসে আছে। বাবার হার্টের অসুখ ধরা পড়ার পর আর তেমন কাজ করতে পারে না। অপারেশনে কতগুলো টাকা বেরিয়ে গেল। সবই তো ওর লগনের উপার্জিত পয়সা। বাবার প্রতিমাসের ওষুধ-পথ্যির খরচ, বোনের পড়াশুনো, সংসার খরচ, লাইটের বিল, তার ওপর সিলিংএর বাঁশ আর টালিগুলো এবার না বদলালেই নয়, গত বর্ষায় কোনোভাবে এ কোনে সে কোনে বাটি,গামলা, চট পেতে বহু কষ্টে কাটিয়েছে… মা চারবাড়ি রান্নার কাজ করে আর কতদিন সামলাবে, শরীর ভেঙে পড়ছে ক্রমশ। আগে দু-চারটে টিউশনি করতো রেশমি। আর কেউ পড়াতেও দিতে চায়‌না। এই লগন করেই এক-একটা সিজনে কুড়ি-তিরিশ হাজার টাকা করে বাড়ি নিয়ে যায়। বছরে দুটোই মরশুম। বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসটায় বড় লগন আর মাঘ-ফাল্গুনে ছোট লগন। বড় লগনে দিন বড়, বেশীক্ষন নাচতে হয় তাই টাকা একটু বেশী শাদি পিছু হাজার দুয়েক টাকা অবধি পাওয়া যায়‌। তার ওপর ছুট আছে। পনেরটা শাদিতে নাচলেই তিরিশ হাজার উঠে যায়। অবশ্য এই চড়া রোদে নেচে যদি জ্বর-জারি বাঁধায় তো সব পন্ড। ছোটো লগনে দিন ছোটো তাই টাকাটা হাফ হয়ে যায়। সিজনের মাসগুলোতেই খালি রোজগার। অন্য সময়ে তো একেবারে বসা। সেই টাকাতেই সারা বছর চলে। না এসে উপায় কি…!

এবারের অ্যাডভান্সের টাকাটা মায়ের হাতে দিয়ে ঘরামিকে কাজে লাগাতে বলে এসেছে। হঠাৎ টিটির ডাকে সম্বিত ফেরে রেশমির।

-“টিকিট?”

– “এ লো বাবু…”

– “এ তো জেনারেলের। ইধার কিউ? উতরো…”

-“দেখো না বাবু, ইয়ে ভারী দো ব্যাগ লেকে জেনারেল মে উঠ নেহি পায়া হম। লোক আয়েঙ্গে তো সিট ছোড় দেঙ্গে। এক কোণে মে বৈঠক কর চলে যায়েঙ্গে বাবু। মত উতারিয়ে। “

-“ইয়ে রিজার্ভেশন কামরা হে। ইহা মে জেনারেল কা টিকট্ অ্যালাও নেহি হ্যায়। ফির রাত মে লোগো সে প্যায়সা মাগেগি না? চলো চলো উঠো, নিকলো…”

পায়ে পড়ে যায় রেশমি- “হম হিজরা নেহি হে বাবু”। শাদি মে নাচনে কে লিয়ে আড়া যা রহে হে” কিসি সে ভি পয়সা নেহি মাঙ্গেগে বাবু”। হমে বস এক কোনে মে বৈঠ কর মানে দিজিয়ে।”

গার্ডকে ডেকে- “ইয়ে কাহা সে আ গেয়ি রে..! চল্ ইধার আ…”

দরজার এককোনে ডেকে নিয়ে টিটি বলে – “ইস কামরা মে যানা হে তো পৈসা লাগেগা। কিতনা হ্যায় তেরে পাস? হাতে মাত্র দেড়-হাজার টাকা নিয়ে বেড়িয়েছে ও। পাঁচশ কমিয়ে বলল- “হাজার লে কর ঘর সে লিকলে হে সাহাব।”

– “ঝুট মত বোল। সচ্ বতা কিতনা হ্যায়। “

– “সচ্ বাবু। দেবী মা কি কসম। গলা ছুঁয়ে বলে রেশমি।”

– “সরু চোখে চশমা নামিয়ে দেখে নিয়ে টিটি বলে- “লা সাতশো দে”

– “স্টেশন মে উতরকর আড়া সে বহত দূর এক গাও মে জানা হে বাবু। আপ পাঁচশো রাখ লিজিয়ে‌।”

-“জিতনা বোলা উতনা হি লাগেগা। বহৎ লোগোগো মানানা হে।”

শেষমেশ সাতশোই দিতে হল। বাথরুমের পাশে মেঝেতে একচিলতে জায়গায় বসে যাবে এমনটাই ঠিক হল। গার্ডদুজন আপাদমস্তক ওকে জরিপ করে ঠোঁটের কোনে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে মুচকি হেসে টিটির সঙ্গে চলে গেল।

বগিতে যত লোক ছিল, সব ঝুঁকে পড়ে ওকে দেখছে। এখন আর এসব দেখাদেখিতে খুব একটা বিচলিত হয়না রেশমি। সবজায়গায় সর্বক্ষণই লোকে হাঁ করে দেখে। গোটা সমাজের ওকে নিয়ে এসব তামাশা গা সওয়া হয়ে গেছে ওর । বাথরুমের গন্ধে এদিকটায় বসা যাচ্ছে না। ভেতরটা গুলিয়ে উঠছে। পুরো কামরাটা একবার দেখে ঘুরে এলো ও। ওদিকটায় বাথরুমেও একই অবস্থা। দরজার কাজটা ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে আছে।

ইতিমধ্যে অনেকে উঠেছে। বগির অনেকটাই প্রায় ভরে গেছে। দু-একজন বাঙালি আছে বটে। বেশীরভাগই বিহারি পরিবার। অল্পবয়সী কজন ছেলেও উঠেছে। বিহারী বলেই মনে হচ্ছে। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ওদের সিট পড়েছে। কিন্তু সকলেই বন্ধু। পরিবারের সঙ্গে থাকা লোকজন সাধারণত খুব একটা সাহায্য করতে চায় না। কিন্তু দরজার একেবারে ধারে ব্যাগগুলো রাখা খুব নিরাপদ নয়। সেগুলোর একটা ব্যাবস্থা করতে পারলে, একটা বার্থের দুটো সিটের মাঝে মেঝেতে পেপার বিছিয়ে শুয়ে রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে দিতে পারবে। তবে লোক বুঝে সেইমতো কথা বলতে হবে। তবেই কাজ হবে। ছেলেগুলোর মধ্যে দুজনের মুখে ওকে দেখে একটু ফিচেল হাসির রেখা লক্ষ্য করেছিল। ট্রেনের বেসিনের আয়নায় মুখটা একবার ভালো করে দেখে নিল। শরীরের গড়নটা ওর বেশ ছিপছিপে। কিন্তু চোখের কোনে কালি, মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট। চিবুকের নিচে গলার কাছে দু-একটা মোটা রোমের উপস্থিতি হাত দিয়ে টের পেলো। সকালে শোন্না দিয়ে সব ওপরানোর পরও একটা-দুটো রয়ে গেছে। এই এক জ্বালা, বারে বারে গোড়া থেকে উপরে ফেলার পরও নির্মূল হয়না। পুরো মুখের রোমরাজি তোলার পর এক-দুদিন ব্যাথায় গালে হাত দিয়ে পারে না। পুরো চিবুক সহ ঠোঁটের ওপরের অংশ লাল হয়ে থাকে। আবার এক-দু সপ্তাহ পরই মুখে দেখা দেয় সবুজাভ আভা। তাও বারে বারে গোড়া থেকে তুলে মুখে ফেসিয়াল হেয়ারের গ্ৰোথ অনেক কমিয়ে এনেছে রেশমি। এই শব্দটা নতুন শিখেছে ও। দাড়ির বদলে ফেসিয়াল হেয়ার শব্দটির ব্যাবহারই ওর বেশী পছন্দের।

নখ দিয়েই ওগুলোকে উপরে, হাতব্যাগ থেকে ফেস পাউডারের কোট বের করে পাফটা একবার বুলিয়ে নিল, দোনোমনো করেও হাল্কা লিপস্টিক ছোঁয়ালো ঠোঁটে। তারপর বহুল ব্যাবহারে ঢিলে হয়ে যাওয়া প্যাডেড ব্রা’টা টেনে উঠিয়ে ঠিক করে, প্লাক করা ভুরু বারদুয়েক নাচিয়ে মুখে হাসি টাঙিয়ে দেহবল্লরী দুলিয়ে ব্যাগের হিল্লে করতে চলল।

– “অ্যাই, তোমাদের এখানে দুটো ব্যাগ একটু রাখবো গো?”

দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের দলের দুটো ছেলে সিগারেট খাচ্ছিল ওদেরই সবচেয়ে ফাজিল বলে মনে হয়েছিল হয়েছিল রেশমির। ওকে দেখেই ওরা তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো। ভাঙা বাংলায় বলল

– “কি চাই গো?”

-“আমার দুটো ব্যাগ একটু এখানে রাখা যাবে?”

-“এটা তো আমাদের সিট গো, কোথায় যাবে তুমি?”

কথার ধরনে গা জ্বলে উঠল রেশমির। গলাটা নরম করে বলল- “একটু ব্যাগদুটো রাখার জায়গা পেলে ভালো হতো। দরজার পাশে রাখলে প্রতিটা স্টেশনে লোকজন ভারী লাগেজ নিয়ে ওঠার সময় এত কথা শোনাচ্ছে…!”

-“তা রাতে তুমিও থাকবে নাকি আমাদের সাথে” বলে খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল।

-“ব্যাগগুলো নিয়ে আসি তালে”

-ঐ হাসিতে কান গরম হয়ে যায় রেশমির, হাসিটা কানে যেন চ্যাটচ্যাটে থুতুর মতো লেগে আছে। এরকম কত আবর্জনা প্রতিমুহূর্তে নিয়ে বাঁচতে হয় ওকে। ওরাই ব্যাগপত্র সরিয়ে ওর ব্যাগের জায়গা করে দেয়। ব্যাগ দুটো রেখে, ট্রেনের দরজার কাছে চলে আসে ও। এরমধ্যেই সাড়ে দশটা বেজে গেল। ওদের কামরায় রাতের খাবার দিয়ে গেছে অনেকক্ষন। খাবারের থলেটা বের করে খেতে গিয়ে দেখে খাবারে গন্ধ হয়ে গেছে। মা গরম খাবারটাই বন্ধ করে রেখে কাজে চলে গিয়েছিল বোধহয়, ভেপসে গেছে। ডেলিভারি বয় যখন খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে যাচ্ছিল, ওকে বলে একটা ডিমভাতের প্লেট পাওয়া গেল। আরও আশিটা টাকা বেড়িয়ে গেল হাত থেকে। দুটো বাচ্চা টয়লেট করতে এসে ওর খাওয়া দেখছে। একজন আবার মা’কে কানে কানে কি বলার চেষ্টা করছে যেন। ওর ব্যাপারেই যে কিছু বলছে তা বুঝতে অসুবিধে হল না। বাচ্চাটার মা ওর মুখটা রেশমির দিক থেকে ঘুরিয়ে নিল। রেশমি একটু ভাব জমাবে ভেবেও, নিরাশ হয়ে খাবারে মন দিল।

রাতে আলোগুলো নিভে যাওয়ার পর কোনো একটা বার্থে মেঝেতে একটু জায়গা করে শুয়ে নেবে। ঐ ছেলেগুলোর ঘুমিয়ে পড়লে ওখানেই না-হয় শরীরটাকে একটু গুঁজে দেবে। একা একা এই ট্রেনের জার্নিগুলোতে এত উপদ্রব আসে। দু-চোখ এক করা মুশকিল। গার্ডগুলো অবধি নানা অছিলায় গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে চায় বুকে কি আছে। এই জায়গায় বড় স্পর্শকাতর রেশমি‌। প্যাডেড ব্রা’র নীচে ওর চ্যাটালো বুকের কথা কাউকে জানাতে চায় না ও। নাচের সময়ও বুকটুকুকে অন্যের হাতের ছোঁয়া থেকে বড় সাবধানে বাঁচিয়ে রাখে। বুকবিহীন নারী-জীবন এখনও ওর কাছে খুব লজ্জার। বিজলিদের দেখাদেখি গর্ভনিরোধক বড়িও অনেক খেয়ে দেখেছে, কিন্তু বুকটা কিছুতেই বাড়ে নি‌। একটু একটু করে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের জন্য টাকা জমাচ্ছে। লাখখানেক লাগে। বছরদুয়েকের মধ্যেই করিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে আছে ।

একে একে বার্থের আলোগুলো নিভে আসে। এবার গিয়ে একটু শুয়ে না নিলে কাল পুরো দিনটা টানতে পারবে না। গোটা দিন ধরে নেচে বারাতিদের মনোরঞ্জন করতে হবে। ভেবেই মেজাজটা খিঁচড়ে যায় রেশমির। ঐ অসভ্য ছেলেদুটো একটা বার্থের আপার সিটে মোবাইলে ব্যাস্ত। ওদের এড়িয়ে একটু দূরে সিটের নীচে রাখা ব্যাগগুলোর কাছে এগিয়ে যায় ও‌। এদিকে ওদিকে চেয়ে দেখে ছেলেদের গ্ৰুপটার মধ্যে একটু মুখচোরা দুটো ছেলে পাশের বার্থেই নীচের দুটো সিটে শুয়ে আছে। ওদের কাছে জিজ্ঞাসা করে মেঝেতে খবরের কাগজ বিছিয়ে শুয়ে পড়ে ও। কানে আসে ঐ বাচ্চাদুটোকে তাদের মা হিন্দিতে রূপকথা শোনাচ্ছে। ওকে আর বোনকেও রেশমির ঠাম্মা ছোটোবেলায় এরকম গল্প শোনাতো।

মনে মনে হিসেব করে রেশমি, এবার লগনে একটাও শাদি মিস করবে না। এরকম কয়েকটা লগন করতে পারলেই ঘরটা পাকা করে, বুকটা বসিয়ে, বোনের বিয়ের জন্য কিছুটা টাকা জমিয়ে ফেলতে পারবে। নীচের অপারেশনটা না হয় আস্তে-ধীরে করানো যাবে। ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা লেগে গেছে, এদিক ওদিকের টুকরো-টাকরা শব্দে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে দেখছে, বারাতি বেরোচ্ছে… এমা এখনও রেশমি তৈরি হয়নি কেন? ও তাড়াতাড়ি শেফালী বৌদিদের বাথরুমটায় জামা ছাড়তে গেল। সুইটি বাইরে থেকে ডাকছে- “রেশমি বর এসে গেছে শিগগিরই দেখে যা।” ছুটে গিয়ে ঝিলপারের রাস্তায় গিয়ে দেখে ওমা বরের বেশে রাজুকে কি সুন্দর লাগছে..! ওর পাশে ঐ মোটামতন মহিলা কি ওর বউ? রেশমিকে দেখে দূর থেকে হাসছে রাজু। বুক ভেঙে যায় রেশমির। একবার জানালো না ওকে…! হঠাৎ পিঠের কাছে একটা খোঁচায় ঘুম ভেঙে যায় ওর। ধরফরিয়ে ঘুম ভেঙে দেখে ও স্বপ্ন দেখছিল। সত্যিই রাজুর বিয়ে হয়নি ভেবে নিশ্চিন্ত হল। পরক্ষনেই অনুভব করল ওর সারা পিঠে একটা পা বোলাচ্ছে কেউ। চকিতে পাশ ফিরল। নীচের সিটের জায়গাদুটো বদল হয়ে গেছে। যে ছেলেদুটো শুয়ে ছিল তাদের সরিয়ে ওপরের ঐ ফাজিল ছেলেদুটো নেমে এসেছে নীচে। ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে হাসছে। মাথায় আগুন জ্বলে যায় রেশমির। মাথা ঠান্ডা করে শান্তভাবে বলে-“এসব কি করছো? আমি এরকম নই”

– ফ্যাসফ্যাসে স্বরে উত্তর আসে- “একবার উধার বাথরুম কে পাশ চল না মেরি রাণী। তু বহৎ সেক্সী হ্যায়।

-দেখো, আমি ওরকম না

– “ঝুট মত বোল। তেরি য্যায়সি বহতো কো দেখা হ্যায়। চল না, মজা আয়েগা।” উপর মে কুছ হ্যায় ক্যা? ইয়া ঝুটমুট কা… বলে আবার খ্যা খ্যা হাসি।

রেশমি সুর আরো নরম করে বলল- “মেরি এক কঠিন বিমারি হ্যায়। মেরে সাথ জবরদস্তি মত করো। “

-“কুছ নেহি হোগা। মেয়ে পাস প্রোটেকশন হ্যায়। চল না… “

-“দেখো আগার জবরদস্তি কারোগে তো তুমরাহে বাল-বাচ্চা সব মেরে জ্যায়সা হোগা। “

-“বকওয়াস মত কর। অ্যায়সা কুছ নেহি হোতা‌ হ্যায়। তেরে জ্যায়সি বহতো নে লি হে মেরি”

– ওরা নিজের ইচ্ছেয় তোমার সাথে যা করার করেছিল। আমার সাথে জোর করে করলে কিন্তু এরকমই হবে। এই কথায় খানিক দমল ওরা।
এই সুযোগে আস্তে আস্তে ওখান থেকে উঠে দরজার পাশে গিয়ে বসল। একটু দূরেই গার্ডরা বসে ঝিমোচ্ছে। দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন। মোবাইলে দেখলো তিনটে বেজে দশ মিনিট। টয়লেটের গন্ধ গা পাক দিয়ে উঠছে। হঠাৎ সারা শরীরে শীত শীত করে বড্ড কান্না পেল রেশমির। সেই ছোট্টবেলা বেলা থেকে একা একা সব ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে চলেছে। এই জগতে একটা লোকও নেই ওর জন্য ভাবার। রোগা হাতদুটো উল্টেপাল্টে দেখলো। মানুষের মতোই তো মনে হচ্ছে। মনে হয় কোনো এক যাদুবলে যদি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতে সবার চোখের সামনে থেকে। ডুকরে উঠছে ভেতরটা। সমস্ত বঞ্চনার কথা মনে পড়ে অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে সারা শরীর। আর কত? আর কত?

কোনো একটা স্টেশনে এসে ট্রেনটা দাঁড়ালো। চার-পাঁচজন লোক দরজা খুলে ওকে প্রায় মাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে এলো। শুনতে পেলো একজন হেসে অন্যজনকে বলছে “আরে রেন্ডি হ্যায়”। তোর মা-বোনকে বল শালা…! গর্জন করে ওঠে রেশমি। ওর চোখ দুটো রাগে-দুঃখে জ্বলছে। বেগতিক বুঝে লোকগুলো তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে যায়। দুঃসহ ক্রোধে প্রত্যেকটা অপমানের জ্বালা ওর দ্বিগুণ করে সবকটা লোককে ফিরিয়ে দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে অনুভুতিতে ও আর পাঁচজনের থেকে কোথায় আলাদা…! যে যন্ত্রণা প্রতিমুহূর্তে বহন করছে ও তার একটা ক্ষণ অন্তত যাপন করে দেখুক এই শুয়োরের বাচ্চারা ।

ক্ষোভে-বেদনায় আজ আর কান্নার বেগ সামলাতে পারে না রেশমি। শিশুকাল থেকেই অজস্র আঘাতে ভেতরটা যেন একেবারে দগদগে হয়ে আছে। একটা ক্ষত শুকনোর আগেই সপাটে নেমে আসে অদৃষ্টের একের পর এক চাবুক। আজ আর কোনোভাবেই নিজেকে বোঝাতে পারছে না। সমস্ত অস্তিত্বটা কঁকিয়ে উঠে নিজের যন্ত্রণার কথা জানান দিচ্ছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে রেশমি। নিজের কাঁধে হাত দিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। নিজের মাথায় নিজেই হাত বুলিয়ে নিজেকে আদর করতে করতে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে। এইসময় গার্ড এসে দরজা দুটো খুলে দিল। বাইরে তাকিয়ে দেখলো একটু একটু করে ভোরের আলো ফুটছে। পা-দানিতে হাঁটুর ওপর মাথাটা রেখে বসে ও। ট্রেনের চাকা প্রচন্ড যান্ত্রিক শব্দে পিষে যাচ্ছে কচি ঘাস-পাতাগুলোকে। পলকে মনে হয়, গোটা শরীরটাকে যদি বাড়িয়ে দেয় এই ক্ষিপ্র যানটার নীচে ? খুব কষ্ট হবে কি? ওর ছাব্বিশ বছরের সব যন্ত্রনা এক করলে তার চেয়ে বেশি পীড়াদায়ক হবে না নিশ্চয়ই এ অভিজ্ঞতা… কিছু বোধ করার আগেই সবটা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে অনুভবশক্তিটুকুও আর থাকবে না বোধহয়। আর্তনাদ যদি বা কিছু বেরোয় তাও তলিয়ে যাবে প্রচন্ড ঘর্ঘর, ঝমঝম শব্দের নীচে… ভোরের তাজা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা ঠান্ডা জল এসে মুখে পড়ে ঘোর কাটিয়ে দেয় রেশমির। এসব কি ভাবছিল ও…! ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে শরীরে, সেই শীতলতা ছুঁয়ে যাচ্ছে মনকেও। অবশ হয়ে আসছে দেহ। বাবা, মা, বোনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সংসারের তিনটি প্রাণী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। রেশমির জন্য ভাবার কেউ না থাকুক, ওকে অন্তত ঐ মানুষগুলোর জন্য বাঁচতে হবে। বাঁচতেই হবে…।

লেখক অচিন্ত্য একজন সমাজকর্মী, “প্রান্তকথা” সমাজসেবামূলক সংস্থার সদস্য।

Published inStory

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: