Skip to content

যৌবন আজ অসহায় – শুভ্রদীপ

আজ ২ মাসের বেশি হয়ে গেল এলাকাটায় আর লালবাতি জ্বলে না। না, লালবাতি বললাম তার কারণ আছে, কারণ ওইযে আমরা ব্যঙ্গ করে ‘রেড লাইট এরিয়া’ কথাটার প্রচলন করেছি। যেখানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ট্রাফিকের লাল বাতির তথাকথিত সমর্থকদের হানা চলে, ঘড়ির কাটা যেখানে চলে উল্টো পথে নিজের মতো করে, যেখানে পা ফেলতে আগুনের ফোস্কা পরে আমাদের পায়ে অথচ আমরা সবসময়ই হেঁটে যাই তার আশপাশ দিয়ে নদীর স্রোতের মতো বাতাসকে উপেক্ষা করে।
সেই গলিগুলোতে আজ আর হাত ধরে টানাটানি নেই, থাকবেই বা কি করে, মৃত্যুভয়ে মানুষ যে আজ মানুষের কাছে অস্পৃশ্য। অন্ধকার গলির বহুতল বাড়ির ঘরগুলোয় আজ আর সেই ঝাঁ চকচকে আলো জ্বলে না। যে ঘরে আলো দেখে পছন্দ করে ঘরে ঢুকে আলোটা নিভে যেত, সে ঘরগুলোয় আলো জ্বালতে আজ প্রাণে বড় ভয় হয়, মনে হয় আলো জ্বললে তার টাকা মেটাবে কে..? ছোট ছোট টুলে বসে থাকা মা-মেয়েরা আজকাল আর বিকেল হলে জুঁইয়ের মালাটা খোঁপায় বাঁধেনা। অবশ্য খোঁপায় বেঁধেই বা লাভ কি..? সেই ফুলের সুবাসে মগ্ন হয়ে যারা সারা শরীরে আল্পনা আঁকতে মেতে ওঠে তারা যে আজ মুখে মাস্ক পরে ঘরে বসে রয়েছে।


যেন এক যুগ কেটে গেছে, সকালে স্নান সেরে আলমারি থেকে তাদের প্রিয় রঙিন সিন্থেটিক চকচকে জরি বসানো শাড়িগুলো পড়া হয়নি। নকল গয়নার বাক্সটায় আজ ধুলো পড়েছে..! মুখের সস্তার মেকআপের আড়ালে যে মুখগুলো বহুবছর চাপা পড়ে ছিল, আজ তারা বহুদিন পরে ফুটে রয়েছে। কাজল না পড়া চোখগুলো আজ মানুষ খোঁজে, পেটের ভাত খোঁজে..! যদি একটাও মানুষ এসে দাঁড়ায় তাদের দরজায়, না হয় তারা ভাগ করে নিজেদের বিলিয়ে দেবে, বদলে দুমুঠো খেতে তো পাবে সকলে মিলে।
কিন্তু না, কেউ আজ তাদের বুকে টেনে জড়িয়ে নিয়ে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলে না, আজ বহুদিন কোনো আঙ্গুল তাদের স্পর্শ করে না..! স্পর্শ করলে যে সঙ্গে সঙ্গে বাবুদের স্যানিটাইজার ঘষতে হবে।
আজ আমাদের সরকার দিনের বেলায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডিস্টেনসিং-এর বুলি পড়ালেও যুগ যুগান্তর ধরে সমাজের বুকে এই মায়েদের থেকে আমরা কিন্তু দিনের আলোয় ছোঁয়াচ বাঁচিয়েই চলেছি, অথচ কি বিচিত্র এই সমাজ বলুন, যে রাতের অন্ধকারে এক প্রহর তারা ইচ্ছে করলেও কাছে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি, ওই পেটের দায় – অথচ আজ তারা ইচ্ছে করলেও কাছে যেতে পারছেন না..! হ্যাঁ, আজ সত্যিই তারা জীবন টানার জন্য মানুষ খোঁজে, নরকের অতিথি খোঁজে। যারা এত বছর ধরে প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেকটা মুহূর্ত মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে চলেছে, যাদের মন মরে গেছে অগণিত বার, তারা কি আজ এই সম্মুখে দন্ডায়মান মৃত্যুকে ডরায়..? না তারা ডরায় না, এই মৃত্যুর ভয়েই আজ তাদের জীবনকে দরকার, সেই মানুষগুলোকে দরকার।

এলাকার মদ-মাংসের দোকানগুলোয় আজ তেমন ভিড় নেই, অন্যান্য মদের দোকানে ভিড় থাকলেও এই দোকানগুলোতে ভিড় করার মানুষের বড় অভাব আজ। দু-পা করে এগোতেই যাদের দোকানের পাশ থেকে চাটের কিলো কিলো কষা মাংসের গন্ধ নাকে ছুটে আসে, আজ তাদের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না। বাচ্চা মেয়েটা আজ বহুদিন মাংস খায়নি। আগে তো রোজ বাড়িতে দোকানের বাড়তি মাংস আসতো, সে বোঝে না যে আজকাল কেন রোজ আধপেটা খেয়ে তাকে থাকতে হয়..! দালালগুলো আজকাল বেশ বিশ্রাম পাচ্ছে, সারাদিনের ছোটাছুটি আজ আর নেই। দশ পার্সেন্ট কমিশনের টাকাটা হয়তো পকেটে আসছে না, দুবেলা হয়তো আধপেটা খাবার জুটছে কোনোরকমে, কিন্তু বদলে.. বদলে বিশ্রাম তো হচ্ছে..! দু ধারের পানের দোকান গুলোয় আজকাল আর পান-সিগারেটের জন্য লম্বা লাইন পড়ে না। বাড়ির ছুটকা-ছোকরা ছেলেগুলো আজ আর বাবুদের জন্য পান-সিগারেটের অর্ডার দিতে আসে না। কেমন যেন সিগারেটের ধোঁয়ার মতন সবটাই মিলিয়ে গেছে। বেনারসি পানের জর্দার গন্ধে, আজ চারিদিকের বাতাসটা আর সুগন্ধি হয়ে ওঠেনা। যেন এক গলা পচা মৃত্যুভয়ের দুর্গন্ধ সেই বাতাসকে গ্রাস করেছে। কিন্তু এখনো এমন কোনো মাস্ক তৈরি হয়নি যা এই দুর্গন্ধের হাত থেকে এই মায়েদের বাঁচাতে পারে।


চারিদিকে সরকারি তোড়জোড় আছে, বড় বড় প্রতিশ্রুতি আছে, রেশনের চাল ডালের স্তব বাক্য আছে, দান তহবিলের টাকার ছড়াছড়ি আছে..! কিন্তু যাদের রেশন কার্ড নেই, আধার কার্ড নেই, যারা যাদের বাড়ি ঘর কিছুই চেনেন না..? সেই কোনো এক আমলে কোনো এক জল্লাদের পাল্লায় পড়ে অল্প দরে বিকিয়ে গিয়েছিল মাসির কাছে। তাদের কি আছে..? কি আছে সেই সমস্ত ছোট ছোট শিশুগুলোর যারা এই অন্ধকার কুঠুরিতে দিনের পর দিন পিতৃহীনতার পরিচয় নিয়ে কাটাচ্ছে..! আজ অবধি তো কোনো খবরের চ্যানেলে একটাও মন্তব্য শুনলাম না, এই মায়েদের নিয়ে, এই বোনেদের নিয়ে। কিন্তু কেন..? এঁদেরকে আমরা আনটাচড্ সোসাইটির আখ্যা দিয়েছি সেই জন্য..?এবিষয়ে একটা কথা মনে করিয়ে দিতে আমি বাধ্য হচ্ছি, যে আমাদের ঘরের মা বোনেরা কিন্তু এই মানুষগুলোর কল্যাণে নিরাপদে নিঃসংকোচে রাস্তায় বেরোতে পারেন। এই মানুষগুলো প্রত্যেকটা মুহূর্ত নিজেদের সম্মান বিক্রি করে সমাজের এক বিশাল উপকার করে চলেছেন। কিন্তু এঁদের উপকার, কে করবে এঁদের উপকার..!

শুভ্রদীপ – ‘রবীন্দ্র-নৃত্য’এর অধ্যাপক ও গবেষক।পাশাপাশি তিনি গদ্যকার,প্রাবন্ধিক ও চিন্তক।ভ্রমণ পিপাসু একজন মানুষ। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কাজের সাথেও যুক্ত।আর সেই সঙ্গেই বর্তমানে তিনি ‘কথাবৃক্ষ’এর একজন সহ-সম্পাদক।

Published inFeature Writing

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: