Skip to content

সংকটে সভ্যতা – সম্পাদকীয়

Last updated on June 3, 2020

কথায় বলে না ‘একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর’ – তবে এক্ষেত্রে করোনা একা নয় সাথে আছে দাবানল, পঙ্গপাল, ভূমিকম্প আর উমপুনও। এমনিতেই এই বছরটা গোটা পৃথিবীর কাছেই ভীষণ ভাবে আতঙ্কের আর একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জেরও – কারণ বিশ্বের বহু দেশেই করোনা থাবা বসিয়েছে।ইউরোপ, আমেরিকা, চীনের পাশাপাশি ভারত’ও তার বাইরে নয়। তবে এই বিগত এক-দেড় সপ্তাহে ভারত কে করোনা ছাড়াও দবানল, পঙ্গপালের আকস্মিক আক্রমণ, ভূমিকম্প আর উমপুনের মতো বিধ্বংসী বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই সঙ্গেই লকডাউনের ফলে আগে থেকেই তৈরি হয়েছে এক বিপুল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসা যাক দাবানলের কথায়।কিছু মাস আগেই পৃথিবীর মানুষ সাক্ষী থেকেছে আমাজন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশাল অরণ্যের বিধ্বংসী দাবানলের। এছাড়াও দু’বছর আগে বৈষ্ণবদেবী অঞ্চলের বনের একাংশ ভয়াবহ দাবানলে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এবছর আবারও এই করোনা-লকডাউনের মধ্যেই ভারতের উত্তরাখন্ডে দাবানল এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিচ্ছিন্ন ভাবে এই অঞ্চলের বনের অন্তর্গত ১,২০০টি বিভিন্ন এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আসলে যে প্রকৃতি এক দিন আদিম গুহা মানব কে আশ্রয় দিয়েছিল, যত দিন গেছে মানুষ যত আধুনিক হয়েছে তত মানুষ তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই আজ বহু যুগের সঞ্চিত পাপে প্রকৃতি নিজেই যেন এই ক্ষয়িষ্ণু আত্ম-অহংকারী উদ্ধত সভ্যতার চিতা সাজিয়েছেন।

এই বিধ্বংসী দাবানলের তাপ যতক্ষনে খানিকটা হালকা হয়েছে, ততক্ষনে আরেকদিকে আবার ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়েছে পঙ্গপালের দল।
‘পঙ্গপাল তাড়াতে না পারলে এ বার কাজে ভঙ্গ দিতে হবে’—
‘পঙ্গপাল’ শব্দটার সঙ্গে এই ভাবেই আমাদের পরিচয় অনেক ছোটবেলায় সহজ পাঠের হাত ধরে হলেও তার ভয়াবহতা আমরা এখন হাঁড়ে মজ্জায় টের পাচ্ছি। একেই করোনার কারণে লকডাউনের জেরে ফসলের ন্যায্য দাম পাননি কৃষকেরা, তার ওপর আবার ছোট একটি পতঙ্গই এখন দেশের কৃষকদের কপালের ভাঁজে ভাঁজে দুঃশ্চিন্তার কারণ। রাজস্থান, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সহ দেশের ৭টি রাজ্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পঙ্গপালের দল। বিঘের পর বিঘে জমির ফসল শেষ হয়ে যাচ্ছে চোখের নিমেষে। বিশেষজ্ঞদের মতে পঙ্গপালের একটি দল ২৫০০ মানুষের সারা বছরের খাবার শেষ করে দিতে পারে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। যদিও কৃষি বিজ্ঞান দপ্তর, মন্ত্রক এবং বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্বাবধানে এই ধ্বংসলীলা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে চিন্তা একটাই, একে লকডাউন, অর্ধাহারে অনাহারে দেশ বেঁচে আছে…. তার ওপরে যদি অন্ন সংস্থানের মূল ঘাঁটিতেও আঘাত পরে, তাহলে সেটা সমগ্র দেশবাসীর পক্ষে খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

এবার আসি ভূমিকম্পের কথায়। প্রকৃতির প্রতি মানবজাতির কর্মফল একত্রে মিলিত হয়ে বোধহয় পরিকল্পনামাফিক আক্রমণ শানিয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে। করোনা যুদ্ধে যখন লক ডাউনে গোটা দেশ, তখনই একের পর এক ভূমিকম্পের হানা দেশের উত্তর প্রান্তে। এপ্রিল মাসের ১৩ ও ১৪ তারিখে – পরপর দুদিন দিল্লি ও তার পার্শবর্তী এলাকা কেঁপে ওঠে মানুষের মনে ভীতি জাগিয়ে। যদিও রিখটার স্কেলে মাত্রা ৩.৫ ছাড়ায়নি, কিন্তু ভাইরাস আতঙ্কে পর্যুদস্ত দিল্লিবাসীর মনে আরেক দুর্যোগের আশঙ্কা ঘনীভূত হওয়া অমূলক নয়। এরপর আবার ১০ ও ১৫ মে। এবারের উৎপত্তিস্থল হলো যথাক্রমে উত্তর পূর্ব দিল্লি ও সেন্ট্রাল দিল্লি। এখানেই শেষ নয়, ২৮ ও ২৯ মে’র জমজ ভূমিকম্পে আবার কাঁপলো রাজধানী – এবার উৎপত্তি হরিয়ানার রোহটাক জেলায়, রিখটার স্কেলে হিসেব ৪.৫ ও ২.৯। ভূমিকম্প বিশারদ ও জিওলজিস্টদের মতে, হাই সিসমিক জোন হওয়ার ফলে মধ্য এশিয়াতে উৎপন্ন হওয়া ভূমিকম্পও দিল্লিতে অনুভূত হতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে নিজেই নিজের উৎপত্তিকেন্দ্র হওয়াটা বিরল ঘটনা। অবশ্য এখন আমাদের প্রায়শই এরকম বহু বিরল ঘটনার সম্মুখীন তো হতে হচ্ছে। ২০১৫’র নেপাল ভূমিকম্পের ভয়াবহ স্মৃতিকে উস্কে দিয়ে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কটমুহূর্তে এ যেন প্রকৃতির প্রতিশোধের তর্জন।

এই তর্জনের হাত থেকে কিন্তু আমাদের বাংলাও বাদ পড়েনি। ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘উমপুন’- এর করাল দাপটে তছনছ হয়ে গেছে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বহু এলাকাও। গত ২০ মে’র তান্ডব যেন আমাদের এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তার ক্ষত এখনও দগদগে। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মাথার ওপর ছাদটুকুও চলে গেছে সুন্দরবন সংলগ্ন অসংখ্য পরিবারের। জল নেই, খাবার নেই, ভাঙা ঘর-বাড়ি জলমগ্ন। দুমুঠো অন্নের জন্য হাহাকার। নোনা জল ঢুকে পড়েছে তাদের চাষের জমিতে, খাবার জলটুকুও নেই। নদীবাঁধ ভেঙে তছনছ হয়েছে। ঝড়ের ভয়াল তান্ডবে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কলকাতা-সহ দুই চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, হুগলি, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় উমপুন থাবা বসিয়েছে। যেদিকে তাকানো যাই, চারদিকে ভেঙে পড়েছে গাছ। হাজার হাজার গাছের মৃতদেহ পড়ে আছে, যারা দূষণমুক্ত রাখতো সর্বক্ষণ শহরটাকে। তিলোত্তমাকে মনে হচ্ছে এ যেন এক বিভীষিকাময় মৃত শহর। দোকানপাট ধূলিস্যাৎ।দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি অনেকেই। কলকাতায় বইপাড়াও বিধ্বস্ত। বইবিক্রেতারা আজও অসহায়, তাদের লাখ লাখ টাকার বই জলের তলায় নষ্ট হয়ে গেছে। কতজন যে গৃহহারা, কতজন যে গতিহীন তার হিসেব নেই।

প্রকৃতির কাছে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রজাতিটি একেবারে পরাজিত। প্রযুক্তিও হার মেনেছে মারাত্মক এই ঘূর্ণিঝড়ের কাছে। কবীর সুমনের একটি গানের দুটি লাইন খুব মনে পড়ছে,
“কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে,
বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে”…

এই ভাবেই আমরা সকলেই বোধ হয় আজ নানাভাবে ক্ষত-বিক্ষত প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপের কাছে। তবুও আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। চরম বিপর্যয়ের দিনেও আমরা গভীর প্রত্যয় নিয়েই আগামীতে এগিয়ে যাব। সর্বহারা মানুষদের পাশে দাঁড়াবো হাতে হাত রেখে। জানি ঝড় আসবে, তারপরেও পৃথিবী শান্ত হবে। প্রকৃতি শীতল হবে। দুর্দিন আসবে, তার মধ্যেই ভরসা নিয়ে বাঁচব আমরা। যেমন কবি বলেছেন-
“তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে”॥

Published inEditorial

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: