Skip to content

করোনা আজ-কাল – জয়া নন্দী

সালটা ১৯৭৯ ।আমি তখন বেশ ছোট ।হঠাৎ একদিন টিফিনের পর ঢং ঢং করে স্কুলের ঘন্টাটা বেজে উঠলো।আনন্দে আত্মহারা হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সব দলবেঁধে। কারণটা কি? উঁচু ক্লাসের দাদা দিদিরা জানার চেষ্টা করলেও আমাদের মধ্যে ছিল না জানার কোনো তাগিদ। ছুটি পেলাম তাই শীতের বিকেলটাতে কোয়ার্টারের সামনের মাঠটায় খেলতে হবে বেডমিন্টন কাবাডি আর কুমির ডাঙ্গা। বাড়ি এসে খেয়ে দেয়ে উঠতে না উঠতেই বাবাও সেই দিনদুপুরে এসে হাজির। চোখ মুখ যেন আতঙ্কে ভরা। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম, পুলিশ গাড়ী নিয়ে ঘোষণা করছে ,শহরটাতে কার্ফু ধার্য করা হয়েছে।কেন? কি ব্যাপার?এসব বুঝবার আগেই চারিদিকে লোকজন এদিক ওদিক ছুটতে লাগলো।হুলুস্থুল পড়ে গেল।

বাগানের ভেতরটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম সেদিনকার এক ভয়াবহ বিকেল! মুহুর্তের মধ্যে রাস্তাঘাট হয়ে গেল ফাঁকা। গুটি গুটি পায়ে ঘরে এসে দেখতে পেলাম রেডিও খুলে মন দিয়ে সকলেই আঞ্চলিক ভাষায় খবর শুনছে। মনোযোগ দিয়ে শুনবার চেষ্টা করলাম কারণটা ।তেমনটা বুঝতে না পারলেও বুঝলাম ঘোষকের গলা অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশ গম্ভীর।কার্ফু ইংরেজি শব্দটির সঙ্গে অনেকে অবগত নাহলেও তবুও তারা যেন বেশ হতচকিত ও ভীতসন্ত্রস্ত। কারণ তারা ,অতীতের অনেক রাজনৈতিক দাঙ্গা হাঙ্গামা, দেশবিভাগ,এ সমস্ত প্রতিকূলতার সন্মুখীন হয়েছিলেন। তেমনি , এই কার্ফুটা হলো একটা রাজনীতির শিকার। বয়কট, স্ট্রাইক,পিকেটিং শুনেছি। কিন্তু কার্ফু শব্দ কখনো শুনিনি। এমন পরিস্থিতিতে সাহস করে কার্ফু শব্দটির অর্থটি জিজ্ঞাসা করলাম।English to Bengali অভিধান থেকে অর্থটা বার করলেও, শব্দটার অর্থ বোধগম্য হলো না। যাইহোক , পরে বুঝতে পারলাম নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাইরে বেরোনো বন্ধ, স্কুল,কলেজ,অফিস যাওয়া বন্ধ,বাজার,দোকান-পাট বন্ধ। আইন শৃঙ্খলা অমান্য করলেই,প্রাপ্য হিসাবে চরম শাস্তি জুটতে পারে কপালে।কার্ফু দীর্ঘ মেয়াদী হলো। তারপর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলো। পড়াশোনার থেকে রেহাই। চিন্তার ভাঁজ বাড়ির অভিভাবকদের কপালে পড়লেও মনে মনে আমার মতো ছোটো ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা বেশ খুশি। ভবিষ্যৎ যাইহোক না কেন পড়াশোনা- পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি। গৃহশিক্ষকও আমাদের আগামী দিনগুলি নিয়ে দিশা-হারা।

হাতছানি দিল অগাধ স্বাধীনতা । অজান্তেই মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে সবুজ মাঠে করতে লাগলাম বিচরন। পথে ঘাটে মনের মতো ঘূরে বেরিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে কাটাতে লাগলাম কতো সময়। ধীরে ধীরে খাঁচার বেড়িটা থেকে বেরিয়ে সোনার দিনগুলো হয়ে উঠল বেশ উপভোগ্য।পড়াশোনাকে করতে লাগলাম অবহেলা ও অবজ্ঞা। এইভাবে দেড়টা বছর কার্ফু ও রাজনৈতিক গোলযোগের সময়ে জীবনটা ছিল বেশ মজারস্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলো আমার মতো অনেকেই।

সরকার থেকে নোটিশ জারী হল যে রীতিমত শুরু হবে পাঠক্রম ও পরীক্ষা।বাড়তে লাগলো পড়াশোনার চাপ ।সামিল হলাম পড়াশোনার মতো ইঁদুর দৌড় প্রতিযোগিতায়। সুখের চেয়ে স্বাছন্দময় জীবন যাপন ছিল বেশি কাম্য। জীবনের স্বপ্ন সাকার করে তুলতে, শুরু হলো তুমুল লড়াই। আক্রমণাত্মক দুঃসাহসিক মনোভাব নিয়ে করতে লাগলাম পৃথিবী জয় । ধীরে ধীরে বিসর্জন দিতে হলো নিজের সংস্কার সংস্কৃতি।বিজ্ঞান সম্মত চিন্তা ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ভুলে যেতে লাগলাম আপন কৃষ্টি সভ্যতাকে। আবেগ ভুলে গিয়ে স্হান পেল বেশি করে যুক্তি তর্ক।।সদর্পে বুক ফুলিয়ে বিশ্বের দরবারে ঠাঁই পাওয়ার জন্য চালিয়ে যেতে লাগলাম অবিরাম লড়াই। এভাবে শুরু হলো মানব জীবনে দৈনন্দিন অরাজকতার এক বিশাল দিক। কিন্তু বুদ্ধিজীবিরা কুফলের পরিণাম ধরিয়ে দিতেন । বারবার বলতেন যে সুস্থ সুন্দর সহজ সরল জীবন পারে মানুষকে রোগ মুক্ত করতে। যেচে উপদেশ দেওয়াটা আমরা করতাম উপেক্ষা । অগ্রাহ্য করতে লাগলাম তাদের সতর্ক বাণী। কে জানতো যে এমন উচ্ছৃঙ্খল জীবনই হয়ে উঠবে আমাদের কাল! এদিকে দিনে দিনে বেড়ে গিয়েছিল মানুষের লোভ ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ । সাথে হারিয়ে গিয়েছিল সংবরণ ও সংযত ক্ষমতা।

পৃথিবীর বুকে প্রাকৃতিক সম্পদ কতটা ক্ষতির সন্মুখীন হলো তা শ্রেষ্ঠ প্রাণী হয়ে কখনো ভাববার প্রয়োজন বোধটুকু করিনি তখন ।কিন্তু ২০২০ আদ্যভাগে সেই সব বুদ্ধিজীবী দের বাণী মনে পড়ে। প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল বনজ, খনিজ,জলজ ইত্যাদি, নয়। এদের মধ্যে সমাজের সর্ব শ্রেণীর মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মানুষ ছাড়া অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন অসম্ভব। যেকোনো কারণে এই মানুষ আজকের দিনে বিশ্বান্নয়নকে কেন্দ্র করে ভীষন ভাবে অবহেলিত, বঞ্চিত এবং অত্যাচারিত। বিজ্ঞান উন্নত যুগে ,মানুষ আজও অসহায়।তার প্রমাণ করালগ্রাস ভাইরাস COVID19।এ ধরণের মরণাত্মক ভাইরাসজনিত রোগগুলো যখন মানব দেহে থাবা বসিয়ে যমে-মানুষে পাঞ্জা লড়ে,তা সত্যি মর্মান্তিক এবং ভয়ঙ্কর। মারণরোগ যেমন সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা ইত্যাদি, বিজ্ঞানের অশেষ প্রচেষ্টায় পেরেছে রোগমুক্ত হতে। বিপরীত দিকে দেখা যায় , তিলে তিলে মানুষকে এখনো ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ।কিন্তু COVID19, এমন এক ব্রক্ষ্ম দৈত্য শক্তির থাবা যার সংশ্পর্শে ক্রমান্বয়ে সমগ্র বিশ্বকে করছে কুলোষিত এবং আতঙ্কিত। অবশ্যই ঈশ্বরতুল্য ডাক্তারবাবুরা অভয় দিচ্ছেন নিয়ম মেনে চললে আর ১৪ দিন কোয়ার্ন্টাইনে থাকলে আসন্ন বিপদ থেকে সহজেই মুক্তি।তা বললে কী আর হয়, মানুষের মন বলে কথা। রোগের চেয়ে ভয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত। আজকের এই পরিণতির জন্য দায়ী কারা? আমরা!!!

একটা আলোর দিক নিশ্চয়ই দেখতে পাই সম্প্রতি আট থেকে আশি ,সকলেই প্রস্তুত করোনা ভাইরাস রোগটার সঙ্গে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে।আজ আমি আমার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নবীন কচিকাঁচাদের মনের ভাষা পড়তে পাচ্ছি খুব সহজেই। তারা কি না CORONA শব্দটা প্রথম দিকে ভাইরাস না ভেবে হাসিচ্ছলে তুড়কি মেরে উড়িয়ে দিত। অবশ্যই এর জন্য দায়ী আমরা। তাদের কখনো শেখাইনি অজানা শব্দ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে। অভিভাবকদের সঙ্গে তিক্ত বিরক্ত হয়ে প্রথম দিকে তারা করেছিল ঘোর বিরোধিতা। CORONA ভাইরাসের তাৎপর্য বুঝতে পেল সেদিন যেদিন স্কুল বন্ধের নোটিশ দিল হঠাৎ করে। টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে পড়ে গেল সাড়া। সেই কচিকাঁচা গুলো অজানা Lockdown কথাটার অর্থটাও আমার ছোটবেলার মতো খুঁজে বের করবার চেষ্টা করল। কিন্তু তাদের বুঝতে সময় লাগেনি কারণ এখন মিডিয়ার দৌড়াত্ব অনেক বেশি।রোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করুক বা না করুক পড়াশোনার চাপ থেকে যে মুক্ত সেটা বেশ বুঝতে পারল।ভারী ব্যাগের বোঝা নিয়ে যেতে হবে না স্কুলে। তারা আজ ঘরে বসে যা কিছু করতে পারবে। অন- লাইনে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ঘরে বসেই নিজেদের পাঠ্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। বিশ্ব মারাত্মক রোগের কবলে ঢুলে পড়লেও আমার ছোটবেলার মতো হবে না পড়াশোনার ক্ষতি। প্রযুক্তিবিদ্যা তাদের দিয়েছে যথেষ্ট প্রত্যয়। আজকের প্রজন্মেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পৃথিবীকে আর শোষণ নয়।তাঁকে ভালোবাসতে হবে। দুই হাত জোড় করে তাঁকে স্বাগত জানাতে হবে।সন্ধ্যায় দীপ ধুপ জ্বালিয়ে সুগন্ধিত করতে হবে এই মাতৃভূমিকে। সর্বভুক না হয়ে অতি সাধারণ ভোজন একমাত্র উপায়। মানুষ বনাম ভাইরাসের অদম্য লড়াইয়ের পর এটা হবে পরের প্রজন্মদের জন্য এক নবজাগরণ ও নব দিগন্তের সূচনা।এই আশার বাণী দেখতে পাচ্ছি আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে। CORONA শিক্ষা দিচ্ছে আজকের কচিকাঁচাদের ‘কেন কর না?‘ কথাটা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটাই সবচেয়ে বড় আশার বাণী।
একটা কথা আছে,”The calm comes after the storm.” আমরা এখন সেই শুভদিন টির দিকে তাকিয়ে আছি।

Published inFeature Writing

Comments are closed.

%d bloggers like this: