Skip to content

সেকুলার ফুড ওয়াক – রূপক রায়

৬:৪৫ এ পৌঁছানোর কথা নাখোদা মসজিদের বড় গেটটার সামনে! আজ কপালে নির্ঘাত গালাগাল আছে। ভাবতে, ভাবতেই হাতের সিগারেটের ছ্যাঁকা খেলাম, হোঁচোটও খেলাম বার তিনেক!


এসেছিলাম চাঁদনি। বইপোকাদের ঠান্ডা করার দাওয়াই বাতলেছেন কলেজ-স্ট্রীটের জনৈক বই বিক্রেতা, তারই খোঁজে। খানিক হিল্লিদিল্লির পর পাওয়া গেলেও বেজে গেল ৬:২০! সাবিরের রেজালা কপালে নেই। পাশেই সস্তায় ২ খানা সিঙ্গারা দিয়ে চা জুটেছে তাই রক্ষা। রাস্তা চিনে, পা চালিয়ে গনেশ এভিনিউ ক্রস করে বেন্টিং পৌছতে আরো মিনিট পনেরো। কাজেই কপালে যা আছে তাই হবে ভেবে ফোনটা করেই ফেললাম।
“ভাই বেন্টিং এ, পৌছোচ্ছি, আর মিনিট দশেক।
সৌর নেহাতই ভদ্র। আশ্বস্ত করলো, “আয়, নো প্রবলেম”।
কিন্তু, মসজিদের মাথা চোখে পড়তে পড়তেই আরো মিনিট দশ। ট্রাফিক সার্জেনের ধ্যাতানি আর ঠেলাওয়ালার চোখ রাঙানি হজম করে কোনো রকমে জাকারিয়ার মোড় থেকে ডানদিক নিতেই দুটো জিনিস চোখে পড়ল। এক, সামনেই দণ্ডায়মান আদি অকৃত্রীম নাখোদার সুপ্রাচীন সদর দরজা, আর দুই, আমার ঠিক পেছনে একটা পুরনো রেস্তোরার ক্যাশ টেবিলের গায়ে ঝোলানো প্ল্যাকার্ড;
“সুফিয়া’স স্পেশাল নিহারী! স্টারটিং নভেম্বর ২৪! মর্নিং ৬:৩০ টু ৯:০০ এ.এম।”
না, পা আর নড়ে না, মাথাও স্থির, আশেপাশের ক্যাকোফোনিও খানিক চুপ মেরে গেছে, খালি বুঝলাম বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে আর মুখটা ভর্তি ভর্তি। হাতটা কতক ভলেন্টারি ভাবেই চলে গেল প্যান্টের পকেটে, ফোনে।
“ভাই নাখোঁদার সামনে, চলে আয়।”
“এর মানেটা কি? আমি তো মহম্মদ আলির সামনে দাঁড়িয়ে আছি গত কুড়ি মিনিট ধরে। তাই তো কথা হল। যাঃ বাবা!! ঠিক আছে দাঁড়া আসছি।” সাথে দু একটা চার অক্ষরও বোধহয়! অবিশ্বাস্য কিছুই না!
প্ল্যাকার্ডে চোখ রেখেই আরো একটা সিগারেট শেষ করতে করতে সৌরর দেখা পাওয়া গেল।


প্ল্যানটা আমাদের অনেক দিনের। এবার, বাড়ি আসার সময় ঠিক হওয়ার আগে থেকেই দুজনে ছক কষ্ছি।
“কি দিয়ে শুরু করবি? চাঙ্গেজী?” প্রশ্নটা করে নিজেই খানিক ভেবে বললো, “অবশ্য যা তেল!”
আমি সহমত, “অত তেলে বাকিটা মাঠে মারা যাবে।“
“তাহলে আদমেই যাই নাকি?”
সায় দিলাম, “চল”।
প্যাকেট আর জলের বোতোলটা ওর হাতে ধরিয়ে ক্যামেরাটা বের করলাম।
সুফিয়াকে ডান হাতে রেখে মিটার ৫০ এগিয়ে, প্রথম বাঁদিকটা নিয়ে, অটো-ভ্যান-সাইকেল-বাইকের বটল-নেক কোনোক্রমে টপকে, প্রথম যেটা চোখে পড়লো তা দেখলে অনেক ইংরেজ সাবকই বলবেন;
” ইইইউউ, গ্রসসস”!
কিন্তু আমার মত সাক্ষাৎ মাংসাশী বাঙালী জান্তবের যা বেরোবার তাই বের হল।
জিহ্বা!
লকলকে লেলিহান একহাত একটা জিভ। তার সাথে দু এক ফোটা জলও আসছিল। কোনোক্রমে সামলে আইপিসে চোখ লাগালাম। লোকে লোকারণ্য গলি জোড়া মুহুর্মুহু মাংসের দোকান। তার প্রত্যেকটায় এক হাত লম্বা লম্বা হুঁকে ঝুলছে তৈলাক্ত সিরলনের আর লয়েনের সারি। এ ছবি দু- একটা না নিলে সান্ধ্য প্ল্যানটাই একেবারে মাটি। হাতে সময় একেবারে বাঁধা। সাড়ে সাতটার ওপারে গেলেই আদমে গিয়ে বেদম মন খারাপ হবে, আর তার সাথে সৌরর উদম গাল কেউ আঁটকাতে পারবে না। ওর দিকে তাঁকানোর রিস্ক নেওয়া যাবে না বুঝেই চটপট কগাছি ছবি নিয়ে হাটা লাগালাম।


“চাচা দো সুঁতলি অউর দো বোঁটি দেনা।”
ফিয়ার্স লেনের (চুনাওয়ালা গলির) মাঝা মাঝি হাত চারেক চওড়া একটা গুমটি ঘর। তার ভিতরেই চাচা ভাইপোঁর সুঁতলি-বোঁটির কারখানা। দোকানে বাঁ পাশটায় অন্ধকার একটা গলি। ডানদিকে পাশা পাশি সারি বাধা লাইন হোটেল গোছের কিছু খাবারের দোকান। খুব সম্ভব তার অনেক গুলোই খুব পুরনো নয়। মানে ১০৩ বছরের মাংস আর সুতোর যুগলবন্দি আশেপাশে আর কাউকেই ধোপে টিকতে দেয়নি।
দোকানের উলটো দিকে একটা বাড়ির খোলা দরজায় রঙচটা পর্দা ঝুলছে। আর তার পাশেই একটা লজ্ঝড়ে ফ্ল্যাটবাড়ির বন্ধ কোলাপ্স-এবেল গেট। এই দুয়ের সামনে ড্রেনের উপরে আধ ভাঙা কালভাটটায় এক গুচ্ছ কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়ে বসে-খাওয়ার জোগাড় করেছে। তাদেরই একজন বোধহয়, আমাদের সাথে আড্ডা জুড়ে দেয়।
“দাদারা কি সেন্ট্রাল এভিনিউতে প্রতিবাদে এসেছিলেন?” দেশের রুলিং পার্টির পশ্চিমবঙ্গীয় কর্নধারের নামে চাট্টে কতক চার অক্ষর আওড়ে আরো বললো, “এরপর এলে তো আবার খেতে পাবেন না!”
“না ভাই! অন্য কাজে। এখানে প্রতিবাদে আসিনি। তবে খেতে না দিলে পরের বার আসবো বটেই!”
সৌরর মুখটা দেখবার মত! সবে সুঁতলিড় দানা সুতো ছাড়িয়ে মুখে উঠেছে। আর শুধু ওঠেই নি, বরং মাখনের মত গলে গিয়ে মুখে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। সে অবস্থায় সেন্ট্রাল এভিনিউ আর তার প্রতিবাদ মিছিল সম্পর্কে যে বিন্দু মাত্র আগ্রহ নেই তা ওর মুখে স্পষ্ট! আমিও বুঝলাম ভুল হচ্ছে। ছেলে-মেয়ে, রাস্তা-ঘাট নির্বিশেষে প্রতিবাদ অন্য কোথাও ঠিক পেয়ে যাবো, তবে এই বিপ্লব মাঝ পথে আঁটকে গেলে কাবাব পিপাষু বাঙালী ভুঁড়ি নিজেকে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে? কাজেই ‘হাত থাকতে মুখ কেনো?’ এই লজিকে নিজেকে সামলে নিয়ে বোঁটিতে ঘাঁটি গাড়লাম। মিনিট দশেকের বেশি লাগলো না কাঁচা পেয়াজ আর কুঁচি লঙ্কা সমেত দুটো করে প্লেট সাবাঢ় করতে।
দোকানেরই জগের জলে হাতটা মোটামুটি ধুয়ে বাঁপাশে মূঘল রন্ধনশৈলীর ইতিহাসকে সাক্ষ্মী রেখে আমরা সোজা হাঁটা দিলাম একটা সাইকেল আর ভ্যানের বটল-নেক লক্ষ্য করে।


মিনিট পাঁচেক হাটার পরেই খান দুয়েক খানদানি মোঘোল মিষ্টির দোকান। আমার ইচ্ছেটাই বেশি ছিল। একটু চেখে দেখার। দুজনেই একটু করে বত্রিসা আর গুলাব জামুন চেখে দেখলাম। অনেক খাদ্য বিশারদ অনেক কথাই বলতে পারেন, তবে বাঙালকে হাইকোর্ট আর বাঙালীকে মিষ্টি চেনানোর ধৃষ্টতা না দেখানোই ভাল। ভাল মিষ্টি, খুব ভাল, তবে সে জিনিস কোথায়? গিরিশ পার্ক বেঁচে থাক, বেঁচে থাক স্বামীজির বাড়ির গলি। হাজি আলাউদ্দিন ছাড়িয়ে একটু মন মড়াই লাগছিল। শুধু শুধু সুঁতলি-বোঁটির মাখো মাখো ভাবটা মাঠে মারলাম। যাই হোক। সৌরর দিকে হতাশ ভাবে তাকাতেই বললো
“চল্ ছাতাওয়ালা গলি। ”
ছাতাওয়ালা গলি? নামটা হালেই শুনেছি একটা জনৈক ফুডশোতে। জাকারীয়া স্ট্রীট ছাড়িয়ে মিনিট দশেক সোজা হাটলেই যে রাস্তাটা পড়ে সেটার নাম মেটকাফ স্ট্রীট। রাস্তাটা যার নামে তিনি লর্ড মেটকাফ, ১৮২৬ থেকে ১৮৪৫ অবধি ভারতে গভর্নার জেনারেল। এনার নামেই মেটকাফ হল। কলকাতা পাব্লিক লাইব্রেরী প্রথম এই মেটকাফ হলেই করা হয় যার প্রথম প্রপরাইটর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
বেশ ভালই আড্ডা চলছিল। হাটতে হাটতে চোখ পড়ে যায় রাস্তার দুদিকে। লাইন দিয়ে বড় বড় গাড়ি বারান্দা। বিরাট বিরাট গেট। এ শহরের কলোনিয়াল ইতিহাসের সাক্ষী বাড়িগুলো। একটা গেটে লেখাগুলোয় জঙ ধরেছে কম, বেশ রঙ করা। লেখা আছে;
 এরভাদ ধুঞ্জীভাই ব্যায়রামজী মেহতা
তার তলায়;
 জোরোআস্ট্রিয়ান আনজুমান আতাশ আদারান
একএকটা জায়গা এমনই ইতিহাস হয়ে যায়! ইতিহাসের কোনো ধর্ম হয় না। ইতিহাস শুধু একটা গল্প। যেমন এ শহরও একটা গল্প। রূপকথার মত সমাজের প্রত্যেকটা শ্রেণীর মানুষকে একসাথে আগলে রেখেছে।
মেটকাফের শেষে বাঁক নিয়ে বড় রাস্তা ক্রস করে ছাতাওয়ালা গলিতে পড়া গেল। শূয়োরের মাংসের দোকানগুলো পেরিয়েই আমাদের পরের গন্তব্য “টুং নাম”। টেরিটি বাজারে এক পুরনো চিনা পারিবারিক ব্যাবসা। বাড়ির একতলাতেই ছোট্টো দোকান। বুক দূরূ দূরু, জায়গা পেলে হয়! বাঙালির উপর ভাগ্যদেবী কোনো কারনে অপ্রসন্ন হলে বাঙালী রেস্তোরায় টেবিল পায় না। ওই বত্রীসাই কাল হল বোধহয়!! মন মড়া হয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে এলাম। আহারে ড্রাই চিলি পর্ক!
খাবারের ব্যাপারে অমন পসিটিভ থাকতে আমি সৌরোর মত কাউকে দেখিনি!
“নাহ হোলো না। দুঃখ পাবি না। গনেশ এভিনিউ চল্।”
যে মাংসাশী টুং নামে গিয়ে পর্ক পায় না তার জীবনে দুঃখ ছাড়া আর কি আছে? কর্তব্যকে তাও মর্যাদা দিতেই হয় । অতএব, আরো মিনিট দশেক হেঁটে গোটা দুই সিগারেট পুঁড়িয়ে গনেশ এভিনিউয়ে ওঠা গেল।
“ওই দেখ্। কলকাতার জীবিত চিনা রেস্তোরার সব থেকে পুরনো ওটা। Eau Chew! “
একটু এদিক ওদিক তাকাতে হল। কতবার তো ট্যাক্সি করে ছোটোবেলাতে বাবার সাথে এই রাস্তা দিয়ে গেছি। চোখে তো পড়েনি! গোটা দুয়েক গাছের আড়ালে একটা ২/৩ তলা বাড়ির গা থেকে হলুদ বোর্ড উঁকি মারছে। দেখতে না চাইলে দেখা সম্ভব না। বড়দিনের সময় বলেই বোধহয় কিছু টুনি লাগানো। রাস্তা ক্রস করে রেস্তোরায় ঢোকার জায়গাটা খুজে পেতে একটু বেগই পেতে হল। বাড়িটার মাঝখান দিয়ে একটা সিঁড়ি এঁকে বেঁকে উঠে গেছে। তার দুই দিকে হিঁদু দেব দেবীর ছবি সমেত এক একটা মার্বেল দেওয়ালে খোঁদাই করা। সিঁড়ির প্রথম বাঁকটায় একটা সাবেকি সাইন বোর্ডে লেখা “Eau Chew, No Beef”। সৌর সন্ধ্যের নাম দিয়েছিল “”আ সেকুলার ফুডওয়াক(A Secular foodwalk)”। সুঁতলি-বোঁটির পর এখানে এসে নামটার মাহাত্ম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।


সিঁড়ি পেরিয়ে একটা দরজা ঠেলে যে জায়গাটায় ঢুকলাম সেটাকে রেস্তোরা না বলে একটা পুরোনো বাড়ির বৈঠকখানা বলাই ভাল। এত শান্ত রেস্তোরা আমি কলকাতায় দেখিনি বললেই চলে। গোটা দশেক টেবিলের দুটোয় কিছু লোক আছে। দুটোতেই সেই বিখ্যাত চিমনি স্যুপ। সন্ধ্যে থেকে যা খাওয়া দাওয়া চলেছে তাতে ওই স্যুপ দুজনে নামানো সাধ্যাতীত। তার সাথে টুং নামেও ঠোক্কর খেয়েছি। তাই ড্রাই গার্লিক পর্ক! রান্নার সুখ্যাতি খালি “উহুহু” বললেই করা যায়। লীন শূয়োরের মাংস ড্রাই ফ্রাই করলে সাধারণত শক্ত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তার একটা বড় ব্যতিক্রম চোখে পড়ল। পেযাজের ফালি খুব মিহি না হলেও বেশ কঁচি; তার সাথে গার্লিক সসের একটা অমৃত মিশ্রন। দু কামড়েই মাংস গলে যায়। সন্ধ্যে থেকে ক্রমশ চলছে নেহাৎ, নাহলে এক প্লেটে কাম-তামাম করার পাত্র আমরা দুজনের কেউই নই। তাছাড়া নটা বাজে। বাড়িতে লোক আসবে। সৌরোও অনেক দূর ফিরবে। আমরা উঠে পড়লাম।


রেস্তোরা থেকে বেড়িয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ মেট্রো অবধি মিনিট দশেক হাটায় কেউই খুব বেশি কথা বলিনি। সে শহরে বড় হয়েছি, তাঁর অনেকগুলো ওলিগলির ফেলে আসা নতুন পুরানো গল্প ভাবতে ভাবতেই হাঁটছিলাম। যেমন চুনাওয়ালায় কাবাব সাপ্টে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরেই দেখা পেয়েছিলাম একটা বাড়ির যাতে লেখা রামকৃষ্ণের পদধুলি প্রাপ্ত বসতবাড়ি। তখনও টেরিটির মতই অন্য কিছু ছিল, তখনও আদমের মত অন্য কেউ মাংস পিশতো ওই একই চত্তরে। এই আমার শহর, এই আমার দেশ, এই আমার বৃহত্তর অস্তিত্ত্ব!
“আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে?” (মধূসুদন দত্ত)

Published inFeature Writing

Comments are closed.

%d bloggers like this: