Skip to content

চৈত্রের হলুদ বিকেল – সোহম

শীতকাল। একসাথে মনে পড়ে যাওয়া অনেকগুলো অনুভূতির নাম শীতকাল। কারো কাছে সেটা স্রেফ নলেন গুড়ের মিষ্টি, কারো কাছে বইমেলা, আবার কারো কাছে সরস্বতী পুজো-সহ ছুটির মরসুম। এইসবগুলো ছাড়াও আরো কিছু মুহূর্ত শীতকালকে বয়ে আনে।

বাড়ি থেকে ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে আছে দক্ষিণ-পূর্ব রেললাইন। রাত্রিবেলা যখন চারধার একদম নিশ্চুপ, তখন দূরে ছুটে যাওয়া ট্রেনটার শব্দে শীতকাল নামে। সেই শব্দ কখনো শুনেছি জয়েন্টের অঙ্ক কষতে কষতে, আবার কখনো প্রেমিকার আধো-আধো-কথার মধ্যেই অজান্তে মিশে গেছে। এখন আর জয়েন্ট নেই, প্রেমিকার আগে প্রাক্তন বিশেষণ বসেছে, কিন্তু শীতকাল আমারই হয়ে রয়ে গেছে। যে শীতকালে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে নেমে আসতো। সেই জন্য একটু আগে ক্রিকেট খেলতে যেতে হতো। দুপুর ৩টে নাগাদ, একটু চড়া রোদের মধ্যে। নাহলে কিছুতেই তিনটে ৮-ওভারের ম্যাচ খেলা যেত না। সেইসব ম্যাচে আমার টিমে যে অলরাউন্ডার, ব্যাট-বল দুটোতেই আমাকে যে ভরসা দিত, সে-ও আর নেই। কিন্তু ওর সাথে ম্যাচ খেলে ফেরার দৃশ্য থেকে গেছে। সেই দৃশ্যেকে আবছায়া করে তুলতো কুয়াশার সাদা চাদর আর রুম্পাদের বাড়ির উনুনের ধোঁয়ার সংমিশ্রণ। সেই ধোঁয়া পেরিয়ে আমরা বাড়ির দিকে যেতাম, গায়ে জ্যাকেট চাপানো হত না। দূর থেকে মা-কে অফিস থেকে ফিরতে দেখতাম, কাজ-করা একটা ঘিয়ে-রঙের চাদর গায়ে। জ্যাকেট না-পড়ার জন্য বকুনি শোনার হাত থেকে রক্ষা পেতে, অন্য রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরার জন্য দৌড় লাগাতাম।

আবার কোনো কোনো দৌড় নন্দনে এসে থেমে যেত। দেরি হওয়ার জন্য অনেক অভিমান শীতকালে জমাট বেঁধে থাকতো। দৌড়ে এসেও সে অভিমান গলানো যেত না, কিন্তু নাটকীয়তায় কাজ হতো। শেষ অব্দি, পাশের মানুষটার হাত ধরে ক্রসিং পেরিয়ে মেট্রোর দিকে যাত্রা। রবীন্দ্র সরোবর, মাফলার, সারি সারি বেঞ্চ, হলুদ আলো, অন্ধকার, শীতকালের উষ্ণতা, কলকাতা-পুলিশ, ফুচকা পেরিয়ে ছোট্ট কোনো রেস্টুরেন্ট। তারপর একটা অটো এসে থামতো, আর গান হতো, “কার সাথে বলো, শব্দ ছুঁড়ে ফিরবো বাড়ি!” বুকের মধ্যে চিনচিন-করা শূন্যতা নিয়ে বাড়ি ফিরতেই হতো। বাড়ির যদিও নিশ্চিত কোনো ঠিকানা থাকে না, সেটা থাকে ঘরের। তাই বাড়ি হয়ে যেত কলকাতার অন্য প্রান্তে প্রযুক্তির-নগরীতে। তখন সেখানে শুনশান রাস্তাঘাট। কপাল ভালো থাকলে লেবু-মাখানো ভুট্টা পাওয়া যেত। অথবা রাতের জন্য রুটি-তরকার আয়োজন করে আনতাম। সেই রাত শেষ হয়ে যেত গিটারের সাথে পানীয়ের মিশ্রনে। কেমন আছে সেই রাত?

প্রশ্ন তো শুধু রাতকে নয়, পুরোনো আরো অনেককে। যেমন, চঞ্চল কি এখনো ডিসাইন করে? সাগর কি এখনো রাতের বেলায় কবিতা লেখে? সেই লেখা কোনো সৌম্যকে পড়াতে আসে? শফিকুল কি রাতে হিন্দি গান গায়? কেউ কি সাথে আনাড়ি গিটার বাজায়? সুখময় কি মন-খারাপ হলে সৌম্যকে ফোন করে, চারপাশের হলুদ আলোয় একটু বেড়িয়ে আসার জন্য? বাণীব্রত সিপিএমকে গালি দেয়, তৃণমূলের দিন-বদলের স্বপ্ন দেখে? অংশুমান কি এখনো abstract painting করে, নাকি ওর জীবন এখন বড়ই বাস্তব, সেখানে বিমূর্ততার বিলাসিতা নেই ! শীতকাল এই প্রশ্নগুলোর সামনে বারবার ছুঁড়ে ফেলে আমায়।

এখন আমি কম তাপমাত্রার ঠান্ডা সর্বক্ষণ পাই, কিন্তু সে ঠান্ডায় “শীতকাল” নেই। যে শীতকাল অপেক্ষা করতে বলে উষ্ণতার জন্য, খুব জবুথবু হয়েও। যে শীতকাল ফাল্গুন-চৈত্রের দিকে চেয়ে থাকে। সেই শীতকালেই এখনো বসে আছি আমি। অপেক্ষা করছি সৌম্য, চঞ্চল, সাগর, শফিকুল, এদের সব্বার। গিটার হাতে “চৈত্রের কাফন” গাইবার চেষ্টা করছি A-মাইনরে। স্ট্রামিং করতে পারছি না ভালোমতো, শিখতে চেষ্টা করছি। এই result-oriented money-market-এ শেখার কোনো মূল্য নেই জানা সত্ত্বেও, নতুন স্ট্রামিং প্যাটার্নটা হাতে তোলার চেষ্টা করছি। কারণ শীতকালেই বোধ হয় “চৈত্রের কাফন”-এর সুর আসে, যে সুরে আদ্যন্ত মনখারাপকেও আপন করে নেওয়া যায়। শীতকাল আমাকে অপেক্ষা করাচ্ছে, “চৈত্রের হলুদ বিকেলে”র। আমি চেয়ে আছি আকাশের সাদা মেঘের দিকে। সেই মেঘে আঁকা আছে শীতকালের প্রতীক্ষা, শুধুই চৈত্রের জন্য।

Published inFeature Writing

Comments are closed.

%d bloggers like this: