Skip to content

বড় মুখে ছোট কথা – সৌম্যকান্তি দত্ত

কেন জানি না আমার মনে হয় – বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্য নিয়ে কিছু বলতে বসা বোধহয় চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার থেকেও একটা কঠিন কাজ। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায় বাংলার কিশোর সাহিত্য বা শিশু সাহিত্য এতও বৈচিত্র্যপূর্ণ কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। কেবলমাত্র যে ভারি ভারি কথা, কঠিন কঠিন বিষয় আর বড্ড শক্ত শক্ত ভাষা দিলেই সাহিত্য হয়না – তারই একটা বিরাট নমুনা আমরা পাই আমাদের বাংলা সাহিত্যে। বলা ভাল বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্যে। আসল ব্যাপার হচ্ছে, সহজ কথা সহজ ভাবে বলা আর কঠিন কথাও সহজ ভাবে বলার বিষয়টা কিন্তু মোটে সহজ নয়। কিন্তু মজার বিষয়, এই ব্যাপারটাকেই যে হাতের মুঠোয় আনতে পেরেছে – সেই কিন্তু চমৎকার শিশু কিশোর সাহিত্যিক হয়েছেন। বিষয়টা কীরকম, আমি একটু খোলসা করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি কেমন ?

আমি যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে শুরু করি তাহলে খেয়াল করে দেখা যাচ্ছে ‘সহজ পাঠের’ নামটা এসে যাবেই। ছোটদেরকে বাংলা ভাষার গোড়ার স্তরটা শেখাতে ওঁকে লিখতে হল ‘সহজ পাঠের’ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ (১৯৩০ / বৈশাখ ১৩৩৭)। এরপরে বর্ণপরিচয়ের পাঠটা চুকে গেলে পর একটু জটিল শব্দ আর বাক্য গঠন শেখাতে উনি লিখলেন ‘সহজ পাঠের’ তৃতীয় আর চতুর্থ ভাগ। তবে শেষ ভাগ দুটি প্রকাশিত হয় ওঁর মৃত্যুর কয়েকবছর আগে। নিশ্চয়ই ওঁর নিজের সম্পাদনাই এখানে বজায় ছিল। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগে ছোটদের জন্য এরকম দুটি বই লেখা হয়েছিল বটে, যার মধ্যে একটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ (১৮৫৫) আর অপরটি যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা ‘হাসিখুশি’। এটি অবিশ্যি বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে ‘সহজ পাঠ’ লেখার কিছু আগেই লেখা হয়েছিল।

এরপরে ‘সহজ পাঠ’ কে বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু শিশু কিশোরদের জন্য গল্প আর লেখেননি। নাটক লিখেছেন বটে, যেমন এই মুহুর্তে আমার ‘গেছোবাবা’, ‘মুকুট’ লেখা দুটির কথা মনে পড়ছে। তবে পরে বেশ কিছু ভাল গল্পকে উনি কবিতার আকারে লেখেন ‘কথা ও কাহিনী’-তে। দুটো লাইন এ প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিলাম –
‘পণরক্ষা’
“জলস্পর্শ করব না আর, চিতোর রাণার পণ
বুঁদির কেল্লা মাটির পরে থাকবে যতক্ষণ।।”

এ তো গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটদের লেখার কিছুটা কথা। ওঁর সমসাময়িক আমি যদি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কথা বলি – তাহলে বোধহয় ব্যাপারটা আরও জমবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ঠিক দু’ বছরের ছোট বড়। কাজেই বন্ধুত্ব ওঁদের মধ্যে বেশ মধুর ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু তার রেশ যে কোথায় গিয়ে কোথায় পরবে – সেটা আগে থেকে আঁচ করা বেজায় মুশকিল। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ওঁর নিজের ছাপাখানা ‘ইউ.রায় অ্যান্ড সন্স’ থেকে প্রকাশ করলেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকা। এই ঘটনাটি ওঁরই ছোট ভাই প্রমদারঞ্জন রায়ের মেয়ে লীলা মজুমদার (রায়) দারুণ বলেছিলেন –
“১লা বৈশাখ ১৩২০। সেদিনটি আমার এখনো মনে আছে। সন্ধ্যেবেলা আমরা সকলে দোতলার বসবার ঘরে বসে রয়েছি। দিদির আর আমার হাতের প্রথম সোনার চুড়ি হয়েছে, তার চকচকে রূপের দিক থেকে চোখ ঘোরাতে পারছি না। এমন সময় জ্যাঠামশাই হাসতে হাসতে ওপরে উঠে এলেন। হাতে তাঁর ‘সন্দেশে’র প্রথম সংখ্যা…” (‘পাকদন্ডী’/ আনন্দ পাবলিশার্স)।

লীলা মজুমদার ‘সন্দেশে’র প্রথম প্রকাশ সম্বন্ধে যা বলার তা তো বলেই দিয়েছেন। এরপর বাকিটা মোটামুটি সকলের জানা। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করেন দু’ বছর আট মাস। ১৯১৫-র ডিসেম্বরে ওঁর প্রয়াণের পর বিলেত ফেরত সুকুমার রায় ‘সন্দেশে’র সম্পাদনার ভার নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। তারপর তো ১৯২৩-এ উনিও চলে গেলেন অকালে। অগত্যা ‘সন্দেশ’-এর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন সুকুমার রায়ের ভাই সুবিনয় রায়চৌধুরী। উনি অবিশ্যি বেশ কয়েকবছর ‘সন্দেশ’ চালিয়েছিলেন। একটা সময় দেনার দায়ে ‘ইউ রায়. অ্যান্ড সন্স’ নিলাম হয়ে গেলে পর সুবিনয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে সংস্থার নতুন মালিক সুধাবিন্দু বিশ্বাস যুগ্ম সম্পাদক হলেন ‘সন্দেশ’-এর। তাও অবিশ্যি খুব বেশি দিন টিকল না। তিরিশের দশকের মাঝামাঝিতেই ‘সন্দেশ’-এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর তো বহুবছর বাদে ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় ওঁর বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলিত ভাবে ‘সন্দেশ’-এর পুনঃপ্রকাশ করলেন। সেবছর আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ। পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জায়গায় এলেন লীলা মজুমদার আর তারও কিছু বছর বাদে সম্পাদিকা পদে যুক্ত হলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মেজোমেয়ে পুণ্যলতা চক্রবর্তীর মেয়ে নলিনী দাশ। বেথুন কলেজের অধ্যাপিকা ছিলেন। এবং জীবনানন্দ দাশের ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশের সঙ্গে ওঁর বিবাহ হয়।

এই ‘সন্দেশে’ই প্রকাশিত হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, অবিশ্যি প্রকাশের সময় এর নাম ছিল কেবল ‘গুপী গাইন’। সঙ্গে নিজে ছবিও আঁকেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। সুকুমার রায়ের প্রায় অধিকাংশ ছড়া, কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এই ‘সন্দেশে’র পাতাতেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা এবং ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় ‘সে’। যদিও ‘সন্দেশে’ তা সম্পূর্ণ প্রকাশ পায়নি। এছাড়া বাংলায় প্রথম কার্টুন সুখলতা রাও করেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতেই। লীলা মজুমদারের প্রথম গল্প ‘লক্ষী ছেলে’ প্রকাশিত হয় ‘সন্দেশে’। উনি নিজে অবিশ্যি গল্পের নাম প্রথমে রেখেছিলেন ‘লক্ষী ছাড়া’। পরে ওঁর বড়দা সুকুমার রায় সেটা পালটে নাম দেন ‘লক্ষী ছেলে’। তখন কিন্তু লীলা মজুমদার নন, লীলা রায় নামে গল্প ছাপা হয়েছিল। এছাড়া কাজী নজরুল ইসালামের ‘ভোর’ কবিতাটিও ছাপা হয় এখানে। যদিও প্রকাশের সময় নাম ছিল ‘প্রভাতী’। এমনকি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ইলশে গুঁড়ি’ কবিতাটিও প্রকাশিত হয় ‘সন্দেশে’র পাতাতেই।
এরপরে তো সত্যজিৎ রায় ‘সন্দেশে’র পাতা ভরানোর জন্য কলম ধরলে উনি একের পর এক লেখা শুরু করলেন। গোড়ার দিকে মূলত ট্রান্সলেশানের কাজ করলেও ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’, ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ ওঁর প্রথম দিকের মৌলিক লেখা। তারপর তো প্রফেসর শঙ্কু চলে এল আর ১৯৬৫-র ডিসেম্বরে প্রকাশিত হল প্রথম ফেলু কাহিনী – ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’। এরপরে তো কত ফেলুকাহিনী লিখেছেন সত্যজিৎ রায়। তাছাড়া ছোটগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ইত্যাদি তো ছিলই। আবার নলিনী দাশ লিখেছেন চার মেয়েদের নিয়ে ‘গণ্ডালু’ সিরিজ। আবার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদাশিব, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা, শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অজেয় রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, নবনীতা দেব সেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কে লেখেননি !

এখন কথা হচ্ছে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা নিয়ে এত কথা কেন বললাম ? একটু ভেবে দেখলে দেখা যাবে, বাংলার শিশু কিশোর সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই পত্রিকার ভূমিকা বা গুরুত্ব ঠিক কতখানি। তাকে বাদ দিই কেমন করে!

‘সন্দেশ’ ছাড়াও অবধারিত ভাবে এসে পরে ‘মৌচাক’-এর নাম। এই ২০১৯-এ যার ১০০ বছর বয়েস পূর্ণ হল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই ব্যাপারটা কেমন নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে ! সুধীর চন্দ্র সরকার প্রথম প্রকাশ করেন ‘মৌচাক’, ওঁর ‘এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স’ প্রকাশনা থেকে। ‘সন্দেশ’ পত্রিকার মতনই এই পত্রিকাতেও যে কত গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে – তার ইয়ত্তা নেই। যেমন ঝট করে আমার মনে পড়ছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসটির কথা। পাশাপাশি কাকা-ভাইপো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অজস্র লেখা লিখেছেন ‘মৌচাক’-এর পাতায়।

আরও কয়েকটির নাম উল্লেখ করা খুব প্রয়োজন। যেমন – কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রংমশাল’ অন্যদিকে ঠাকুরবাড়ির জ্ঞানন্দানন্দিনী দেবী ও পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘বালক’, শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত ‘মুকুল’ ছাড়াও ‘শিশুসাথী’, ‘সখা ও সাথী’, ‘সখা’ কিংবা আরও পরে ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত ‘রামধনু’। প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘পক্ষিরাজ’ পত্রিকার কথাও এই প্রসঙ্গে চলে আসবেই। একসময় প্রকাশিত হত ‘চাঁদ মামা’। আমি তার পুরনো কিছু সংখ্যা দেখেছি আমাদের বাড়িতে। আমি জানি না, সে পত্রিকা এখনও প্রকাশিত হয় কিনা ? তাছাড়া ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’, ‘আসন্দমেলা’ তো রয়েছেই। যেগুলো এখনও তাদের প্রকাশ বজায় রেখেছে। আসল কথা কি, কেবল সাহিত্য রচনা করলেই তো হল না ; তার যথাযথ ভাবে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দরকার উপযুক্ত পত্রিকা। যার কিছু উদাহরণ আমি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আবার একটা পত্রিকাও কিন্তু কেবল ভাল লেখা ছাপলেই ছোটদের মন কাড়তে পারে না। লেখার সঙ্গে মানানসই ছবি না থাকলে ব্যাপারটা মোটেই জমে না। একেবারে গোড়ার দিক থেকে ধরলে সমর দে, শৈল চক্রবর্তী, যতীন সেন তারপর তো চলে আসছেন সত্যজিৎ রায়, বিমল দাস, সুধীর মৈত্র, সমীর সরকার, সুবোধ দাশগুপ্ত, নারায়ণ দেবনাথ, আরও পরে সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, দেবাশীষ দেব, শিবশঙ্কর চট্টাচার্য সহ আরও কতজনের নাম বলা যায় !

আমার যদ্দুর মনে পড়ছে বাংলায় ছোটদের জন্য প্রথম বার্ষিকী বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘পার্বণী’। এরপরে তো ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ এর চিরকালীন বার্ষিকী গুলো গতদশকের প্রায় সববয়সী বাঙালীকে মাতিয়ে দিয়েছিল। শুধু গত দশক বলাটা ভুল – আমরাও যে সেসব পড়েই বড় হয়েছি – সেকথা অস্বীকার করা যায় না।
আসলে বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্য সবদিক থেকেই এতো বৈচিত্র্যপূর্ণ – যে একটা লেখার মধ্যে তার সব স্বাদটা মেটানো ভারি মুশকিল। যেন অনেকটা, ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ…’। মজা হচ্ছে, ছোটদের জন্য লেখা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন – একথা অধিকাংশ লেখক-লেখিকারাই বলে থাকেন। কারণ, ছোটদের মনটা ধরতে পারা কিংবা তাদের যে কি ইচ্ছা, কি চাওয়া–পাওয়া, আশা–আকাঙ্ক্ষা সেটা বুঝতে পারা কিন্তু যে সে লোকের কাজ নয়। এই গোটা ব্যাপারটা যিনি মোটামুটি রপ্ত করে ফেলতে পেরেছেন – তিনিই ভাল ছোটদের সাহিত্যিক হতে পেরেছেন।
আর তার সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে রয়েছে পরিমিতি বোধ, সংযম আর বলার কায়দা। ঘ্যানঘ্যানে হলেও চলবে না, বেশি ন্যাকা ন্যাকা হলেও চলবে না আবার খুব গোটা গোটা হলেও চলবে না। তিনটের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে লিখলে তবেই সেটা ছোটদের মন কেড়ে নেয়। নিছক গল্পের ছলে বলাটাও কিন্তু লেখার সময়ে যে বেশ কঠিন – সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর এই সবকটি দিকের কোনও গুণপনাই আমি দেখাতে অক্ষম – একথা ভাবলে বড় ‘ইয়ে’ লাগে। কাজেই আমার বিশ্বাস, সেদিকে আর বেশি ফিসিফিস না করে কেটে পড়াই ভাল।

চিত্রঋণ: comicsindiaproject.com, pinterest.com, amazon.in, readbengalibooks.com, goodreads.com

Published inEssay

Comments are closed.

%d bloggers like this: