Skip to content

অর্থনৈতিক মন্দা ও বর্তমান সময় – প্রীতম চৌধুরী

Last updated on September 18, 2019

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা শব্দদুটি প্রায় প্রাতিশাব্দিক আঙ্গিকে ব্যবহৃত হলেও, দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা দুটির চরিত্র বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে বিচার করব, এই মুহূর্তে আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। অনেকে বলছেন, যে আসন্ন বছরে বিশ্বজুড়ে একটি অর্থনৈতিক মন্দা আসতে চলেছে। কিন্তু সেই মন্দা কি সংকটের আকার ধারণ করবে ২০০৮ এর মতো ?

আগে দেখে নিই, অর্থনৈতিক মন্দার সংজ্ঞা ঠিক কী।

অর্থনৈতিক ক্রিয়ার এক উল্লেখযোগ্য পতন, যা কয়েকমাসের বেশি স্থায়ী হয় এবং যার ফলে জিডিপি, আয়, চাকরি, শিল্প-উৎপাদন ইত্যাদি অর্থনৈতিক স্থিতিমাপক গুলির এক স্থায়ী পতন লক্ষ্য করা যায়, তাই মন্দা বা Recession নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, Business Cycle একটি খুব স্বাভাবিক অবস্থা হল এই মন্দা। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক স্ফীতি ( Economic Boom ) এবং অর্থনৈতিক মন্দা, এরা সাধারণত চক্রাকারে আবর্তিত হয়।

কিন্তু ঠিক কি কি কারণে এই মন্দা অনিবার্য হয়ে ওঠে ?

  • কিছু অর্থনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের ফলে
  • অর্থনৈতিক সম্পদের ভুল ব্যাবহারের ফলে
  • অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির ফলে

এই সব কারণ গুলি একত্রিত হয়ে, এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যার ফলে জিনিসপত্রের বাজারে চাহিদা কমে যায়। চাহিদা নেই, অথচ যোগান আছে, এমতাবস্থায় জিনিসপত্রের দাম কমে যেতে বাধ্য। যার ফলে উৎপাদনকারী সংস্থা তাদের উৎপাদন কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। এই অবস্থা খুব কম সময়ের জন্য হলে ঠিক আছে, কিন্তু যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এর কিছু মারাত্মক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে থাকে। যেমন, উৎপাদক-মহল কর্মী-ছাঁটাই শুরু করে। যেহেতু বিক্রি না হওয়ার ফলে তাদের উৎপাদন চালিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।

এই পরিস্থিতিসমূহ-ই একটু ভয়াবহ আকার ধারণ করলে যা হয়, তাই অর্থনৈতিক সংকট। যা বললেই আমাদের  গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের The Great Depression কে মনে করায়। যা অর্থনীতি বিষয়টির দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছিল। John Maynard Keynes, যিনি Father of Modern Macroeconomics হিসেবে পরিচিত, তিনি প্রমাণ করেন, যে যোগান নিজেই নিজের চাহিদা উৎপন্ন করে, অর্থাৎ “Suppy creates its own demand” এই তত্ত্ব অস্বীকার করে প্রকৃত চাহিদা-ই ( Effective Demand ) যে আসল যোগানের এবং উৎপাদনের ভিত্তি, তা প্রমাণ করেন।

মন্দা ধীরে ধীরে প্রতিটি অর্থনৈতিক মাপকাঠিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুললে আমরা সংকটের সম্মুখীন হই। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ভারতে ১৯৯১ সালে, অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালে, বা সাম্প্রতিক গ্রিসে। যদিও তিনটি সংকটের ভিত্তি এবং চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ১৯৯১ সালের ভারতের অর্থনৈতিক সংকট ভারতকে একটি সীমাবদ্ধ-অর্থনীতি থেকে মুক্ত-অর্থনীতি বানিয়ে তোলে।

কিন্তু বর্তমানে ছবিটা একটু অন্যরকম।

ভারতবর্ষে সাম্প্রতিক যে অর্থনৈতিক মন্দার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা ভাববার বিষয়, এবং তা সরকারের  অর্থনৈতিক অদূরদর্শিতার ফল। বিমুদ্রিকরণ ( Demonetization )এবং অপ্রস্তুত ভাবে জিএসটি এর প্রচলন এর অন্যতম কারণ হতে পারে। যদিও জিএসটি ব্যাবস্থা একটি সুন্দর ব্যবস্থা, কিন্তু এত বড় দেশে তা আরেকটু সময় নিয়ে করলে তা ভালো হত।

বর্তমানে ভারতে গাড়ি শিল্প এক প্রবল সংকটের মুখোমুখি। শুধু তাই নয়, কিছু মাঝারি শিল্প, যেমন বিস্কুট-উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত। এরই মধ্যে ভারতের অর্থমন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেয়, যে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী-আমলা দের ব্যবহার করা গাড়ি গুলি বদলে নতুন গাড়ি কেনা হবে, তাতে কিছুটা হলেও সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু, এই সিদ্ধান্তে দুটি প্রশ্ন আসে, এক, বর্তমানে যে গাড়িগুলি ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেগুলির মেয়াদ নিশ্চয়ই ফুরিয়ে যায়নি, তাহলে সেগুলির কী হবে ? দুই, ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবহার করে এমন গাড়ির সংখ্যা, সমগ্র গাড়ি উৎপাদনের নগন্য শতাংশ জেনেও, সরকারের এরকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণগুলি ঠিক কী ?

ঠিক এই পরিস্থিতিতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা আলোচনা করা দরকার। সেটি হল, রিসার্ভ ব্যাঙ্ক এর সরকারকে দেওয়া ১.৭৬ কোটি টাকা। এর পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলার আগে, কয়েকটি জিনিস একটু জেনে নেওয়া যাক।

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের বানিজ্য-যুদ্ধের ( US – China Trade War ) প্রভাব স্বরূপ নানা মার্কিন সংস্থার দাবী, এই যুদ্ধ আরও অগ্রসর হলে মন্দা আসা অনিবার্য।
  • ব্রেক্সিট নিয়ে এখন যেভাবে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপ টালমাটাল, তাতে ধরে নেওয়া যেতে পারে চুক্তি-যুক্ত অথবা চুক্তি-বিহীন যে ধরণেরই ব্রেক্সিট হোক না কেন, তা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে এক প্রভাব ফেলতে চলেছে।

এই অবস্থায়, যদি সত্যিই ২০২০ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যায়, তাহলে সরকার কী ভেবে তার অর্থনৈতিক সিকিউরিটি এভাবে এখনই ব্যবহার করতে চাইছে ?

ভারতে অর্থনৈতিক মন্দা তেমনভাবে এই মুহূর্তেই প্রকট না হলেও, যে ভাবে টাকার দাম পড়ছে, শেয়ার বাজারে ধস নামছে, এবং সর্বোপরি বৃদ্ধির হার যেভাবে কমছে, তাতে ২০২০ নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে যায় বইকি। ভারতে এই মুহূর্তে জনসংখ্যায় যুবক-যুবতীদের শতাংশ বেশি, তাদের চাকরির জন্য কর্মসংস্থান তৈরি তো ?

ঠিক কোন দিকে এগোচ্ছি আমরা ?

প্রচ্ছদ : Business Insider India

Published inEssay

Comments are closed.

%d bloggers like this: