Skip to content

“আসলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করতে হলে, নিজেকে শূন্য করে কাজ শুরু করতে হবে” – মধুবনী চট্টোপাধ্যায় এর সাক্ষাৎকার

Last updated on May 8, 2020

অনুলিখন : নীলিমেশ রায়

কথাবৃক্ষঃ কোনো গান কেন নাচের গান হয়ে ওঠে?
মধুবনীঃ নাচ মানে তাল, লয়, ছন্দ। নাচের মধ্যে যে অভিব্যাক্তিগত দিক আছে, তা আসলে কিছু মুহূর্তেরই প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে “বিপুল তরঙ্গ রে” যেমন নাছের গান হিসেবেই পরিচিত, কারণ এই গানটি মূলত ছন্দ-প্রধান। এই গানে নৃত্যশিল্পী নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু, “আজি বিজন ঘরে” গানটিতে অনুভূতির প্রাবাল্যই বেশি – এর প্রকাশ হলো বিমূর্ত। এই বিমূর্ততা কে নাচের মধ্যে ধরা কখনই উচিৎ নয়। কিছু কিছু বিষয়, একান্ত অনুভবের মধ্যে পূর্ণতা পায়। আবার, “তিমির অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি” এই গানটিকে নাচের গান হলেও, গানটিতে ভীষণভাবে কবি-কল্পনা মিশে রয়েছে। সেই কল্পনা কখনো অবয়বে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একইভাবে, “যখন ভাঙল মিলনমেলা” গানটিতেও জোর করে নৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিৎ নয়।


কথাবৃক্ষঃ রবীন্দ্রনাথের গানের নৃত্যভাবনার মূল বৈশিষ্ট্য কি ?
মধুবনীঃ শান্তিনিকেতনে একসময় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতেই “সখী, আঁধারে, একেলা ঘরে” গানটির নাচের রিহার্সালের সময় নৃত্যশিল্পীরা মণিপুরি নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে বেশ কিছু নাচের মুদ্রা যোগে এই গানটির নৃত্যরূপ গড়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেইখানেই উপস্থিত ছিলেন – এবং তখন তিনি তাঁদের থামিয়ে নিজেই দেখিয়ে দিলেন যে নাচের মুদ্রা ব্যবহার না করেও কেবলমাত্র চোখের দৃষ্টির মাধ্যমেও গানের বাণীকে কেমনভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। সেখানে চোখের মাধ্যমে মনই কেবলমাত্র প্রকাশিত হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের গান শুধু তাল, লয়, ছন্দ দিয়েই নৃত্যে প্রকাশ করা যায় না, কারণ সেগুলি বহির্মুখী। মনের ভাব হল অন্তর্মুখী অনুভূতি, তা হয়তো চোখের দৃষ্টিতেই শুধু ধরা সম্ভব। নাচকে এইভাবে দেখা ও ভাবা সম্ভব একমাত্র রবীন্দ্রনাথের গানেই।


কথাবৃক্ষ: শাস্ত্রীয়নৃত্যের শারীরিক ভঙ্গিমা রবীন্দ্রনাথের গানে কীভাবে বিবর্তিত হয়?
মধুবনী: শাস্ত্রীয়নৃত্যের কিছু বাঁধা ছক, নিয়ম, সীমা আছে – ব্যাকরণ আছে। এবং সেখানে যে গল্প বা গানগুলি আসে – তাতে প্রেম, বসন্ত আছে – কিন্তু সেখানেও ছক বাঁধা নিয়ম কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ সেই ছকের বাইরে চলে যান বারবার। রবীন্দ্রনাথ যখন বসন্তের বর্ণনা দেন – তার মধ্যে রয়েছে গভীর দার্শনিক বোধ। তাতে জাগতিক স্তরের ঊর্ধ্বে উঠে এক বৃহত্তর ভাবনার আভাস পাওয়া যায়। সেখানে ব্যাকরণ খাটে না।


কথাবৃক্ষ: রবীন্দ্রনৃত্যের মূল শৈলী তবে কী ?
মধুবনী: শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রনৃত্যে অনেকেই মনে করেন মূল ভিত্তি হল মণিপুরি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে মণিপুরির সাথে কথাকলি, দক্ষিণ ভারতীয় কিছু কিছু লোকনৃত্যের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। মণিপুরি নৃত্যশৈলী এসেছিল নৃত্যভাবনার লাস্য – এর দিকটি তুলে ধরার জন্য। তবে সব গানে তা প্রযোজ্য নয়। কোনো পুরুষালি গানে, যেমন, “ নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জ ছায়ায়” – গানটিতে নৃত্য প্রয়োগ করার সময় কথাকলি নৃত্যশৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।


কথাবৃক্ষ: কিন্ত এই পুরুষালি ব্যাপার টা কী?
মধুবনী: আসলে গানের দুটি ভাগ আছে – পুরুষ ও প্রকৃতি। অর্থাৎ তাণ্ডব আর লাস্য। তাণ্ডব হল শিবের পৌরুষের প্রকাশ আর লাস্য হল প্রকৃতির অর্থাৎ পার্বতীর প্রকাশ। লাস্য হল পেলব আর তাণ্ডব হল ঠিক এর বিপরীত। সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ভাবনায় কথাকলি এসেছে পুরুষালি ভাব প্রকাশের জন্য। তবে এই পুরুষালি ব্যাপারটা কেবল পুরুষের তা কিন্তু নয়। কারণ কথাকলি নৃত্যশৈলীতে অনেক মহিলা নৃত্যশিল্পীকেও দেখতে পাওয়া যায়। তাণ্ডব পুরুষালি হলেও তাতে মেয়েদের সমান অধিকার আছে। যেমন দুর্গাকে বলা হয় পুরুষ-স্বভাবা নারী। সেই কারণেই দুর্গার নৃত্য ভাবনায় তাণ্ডব ভাবই বেশি। কিন্তু অপরদিকে কুমারসম্ভব এর পার্বতীর নৃত্য ভাবনায় লাস্য ভাবের প্রাধান্য বেশি।


কথাবৃক্ষ: তাহলে কী রবীন্দ্র নৃত্যভাবনার শৈলী নির্বাচন খুব সচেতন ছিল ?
মধুবনী: হ্যাঁ, অবশ্যই সচেতন। কারণ সেসময় ভারতনাট্যম ব্যাপক প্রচার লাভ করেনি। সেটি ছিল মন্দির বা দেবদাসী কেন্দ্রিক একটি নৃত্য ঘরানা, যেটি দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির গুলিতেই বেশি প্রচলিত ছিল। যেখানে দেবদাসীরা এক একজন নিজেকে বিভিন্ন রস ও ভাবে নায়িকা হিসেবে দেবতাকেই প্রিয় রূপে সাধনা করতেন। পরে রুক্মিণী দেবী এই নৃত্যশৈলীকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেন।
অপরদিকে মণিপুরি নৃত্য রক্ষণশীল ছিল না। এটি ছিল বৈষ্ণবধারার নৃত্য। আগে মণিপুরিরা যোদ্ধা ছিল, সেখান থেকে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় তাদের বিবর্তন ঘটে। সেই মণিপুরি নৃত্য থেকেই রবীন্দ্রনাথ লাস্য ভাবনাটি নিয়ে আসেন। এই লাস্য অন্য এক স্তরের – সেখানে এক বিশেষ স্নিগ্ধতা আছে। ভারতনাট্যম বা মোহিনীাআট্যম এর ক্ষেত্রে সেই সব অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রতিবেশির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কত্থক আবার রাজসভার নৃত্য। এই নৃত্যভাবনায় শৃঙ্গার রসের আধিক্য বেশি।

কথাবৃক্ষ: রাধা-কৃষ্ণের প্রেম রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনায় কেমন ভাবে এসেছে ?
মধুবনী: রাধা-কৃষ্ণের গল্প হল এক অপূর্ব আখ্যান। বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে রবীন্দ্রনাথ রাধা-কৃষ্ণ ভাবনাটি উজার করে নিলেন। সেখানে কৃষ্ণ হলেন প্রেমিক কৃষ্ণ। ভারতনাট্যমের কৃষ্ণ বাৎসল্য-প্রতিবাৎসল্য ভাব দ্বারা প্রকাশিত। রাধা নৃত্যের ভাবনা প্রকাশ পায় চোখের ভঙ্গিমার মাধ্যমে। বাঙালি সংস্কৃতিতে রাধা-কৃষ্ণ প্রথম আসেন কবি জয়দেবের “গীতগোবিন্দম” এর হাত ধরে। সেখানে জয়দেবের নিজ স্ত্রী পদ্মাবতীকে রাধার চরিত্রের জায়গায় রেখে তাঁর রাধা চরিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এরপর প্রত্যেক বৈষ্ণব কবিই রাধাকে কোনো এক রক্তমাংসের মানবীর ছায়া দিয়েই নির্মাণ করেছেন। যেমন, চণ্ডীদাস, তাঁর রাধাকে একেছেন এক গ্রাম্য নারীর ছায়ায়। আবার বিদ্যাপতির কাব্যেও মৈথিলি রাজসভার রানি লছমির অনুপ্রেরণা কাজ করেছে।
ভানুসিংহ সেখানে তাঁর নতুন-বৌঠানকেই রাধার প্রতিরূপ হিসেবে কল্পনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন ছদ্মনামে ভানুসিংহের পদগুলি লিখছেন, তখন তাঁর মনের কাছে রয়েছেন তাঁর নতুন-বৌঠান, কাদম্বরী দেবী। “লিপিকা” গ্রন্থেও রবীন্দ্রনাথ ও নতুন-বৌঠানের সম্পর্কের সেই সমীকরণটাই ভীষণ গভীর ভাবে ফুটে উঠেছে। কাদম্বরীর একাকীত্বের সাথে রাধার একাকীত্ব মিশে গেছে। রাধা ছাড়া কৃষ্ণের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই – তেমনই যেন রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে তাঁর নতুন বৌঠানের প্রভাব একই ভাবে কাজ করেছে।


কথাবৃক্ষ: রবীন্দ্রনাথ কেমনভাবে তাঁর গানে বা সৃষ্টিতে নারীর মন কে ফুটিয়ে তুলেছেন ?
মধুবনী: “তারে আমি চোখে দেখিনি” অথবা “ মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে কে” গানগুলিতে যে নারীর মন প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে আমরা রবীন্দ্রনাথের মনের যে অন্তর্নিহিত অর্ধনারীশ্বর ভাব আছে, তা আমরা দেখতে পাই। মেয়েরাও হয়তো নিজেদের সম্পর্কে এতটা জানে না। আবার, একজন কিশোর যখন লিখছে, “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান” বা “ বজাও রে মোহন বাঁশি”, এই গানগুলির উক্তি রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল তাঁর মধ্যে নারীসত্তার অনুভব ছিল বলে। এই গানগুলির নাচ মনে রাখতে হয় না, আপনা-আপনিই তা প্রকাশ পায়। প্রত্যেক স্রষ্টার মধ্যেই নারী-পুরুষের যুগলবন্দী আছে।
“আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়” গানটিতে কোনো নারীর মনোভাব এমন ভাবে প্রকাশ করা সম্ভব ? মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।


কথাবৃক্ষ: তবে কী রবীন্দ্রনাথের গানে নাচের সময় ব্যাকরণ ছাপিয়ে ভাবটাই প্রাধান্য পায়?
হ্যাঁ, ব্যাকরণের থেকে ভাবটাই প্রধান, কারণ রবীন্দ্রনাথের গানে বাণী যদি নাচের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ না পায়, তবে সব ব্যাকরণ ব্যর্থ হয়ে পড়বে। রবীন্দ্রনৃত্যে গানই শিল্পীকে চালনা করে।


কথাবৃক্ষ: তাহলে রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে নৃত্য পরিবেশনের সময় রবীন্দ্রনাথকে জানা বা বোঝা কতটা প্রয়োজন ?
মধুবনী: সাংঘাতিক ভাবে প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত সকলেই রবীন্দ্রনাথের গানে নাচতে পারবে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে নাচতে গিয়ে শিল্পী যদি তাঁর জ্ঞাণ কে মুখ্য করে তোলেন, তবে তা সেই পরিবেশনাকে নিষ্প্রাণ করে তুলবে। রবীন্দ্রনাথের গানের নৃত্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে শিল্পীকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।


কথাবৃক্ষ: যদি নৃত্যনাট্যের প্রসঙ্গে আসি, তবে শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা – এগুলির পরিবেশনা নিয়ে তোমার কী মত ?
মধুবনী: শ্যামা-র নৃত্য ভাবনায় ভারতনাট্যমের প্রভাব দেখা যায়। শ্যামা বৌদ্ধ জাতকের গল্পে খলনায়িকা হিসেবে চিত্রিত। রবীন্দ্রনাথ সেখান থেকে তুলে এনে শ্যামাকে বহুস্তরীয় নারীচরিত্র করে তুলেছে। শ্যামার শেষে সে যেন নিশ্চিতভাবেই জানে যে সে অপরাধী। এই দৃঢ়তা বজ্রসেন কে দুর্বল করে তুলেছে।
চিত্রাঙ্গদা- এ অর্জুনের চরিত্রের মধ্যেও সেই দুর্বলতা আছে। বিপরীতে চণ্ডালিকার আনন্দ অনেক বেশি উজ্জ্বল।


কথাবৃক্ষ: এই শ্যামা/চিত্রাঙ্গদা বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আজও কতটা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় ?
মধুবনী: ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। যেমন চিত্রাঙ্গদা- এ মদনের বরপ্রাপ্তির পূর্বের চিত্রাঙ্গদা ও নবরূপপ্রাপ্ত চিত্রাঙ্গদার, যারা সাধারণত যথাক্রমে কুরূপা ও সুরূপা বলে পরিচিত, তাদের ভাবনায় নিজেকে ব্যক্ত করতে না পারার ব্যাথা আছে। তা তো সবসময়ই বাস্তব। আসলে কুরূপা, সুরূপা হয় না। সুরূপা হল ‘হতে চাওয়া’। তাই “চিত্রাঙ্গদা” শেষ হয় কুরূপার হাত ধরেই। এই চরিত্রগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সীমা নেই।
আসলে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সব ধারণা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এই চিত্রাঙ্গদার বিপরীতে আবার “চোখের বালি” – র বিনোদিনীর মতো চরিত্রও নির্মাণ করেছিলেন, সেটা ভাবতেই অবাক লাগে।


কথাবৃক্ষ: নৃত্যশিল্পী না হলে রবীন্দ্রনাথ তোমার কাছে কেমন হতেন ?
মধুবনী: আমার রবীন্দ্রনাথ অস্পষ্ট স্বরের প্রথম গাওয়া সেই গান বা প্রথম যার কবিতা পড়েছি, সহজপাঠের পাতায় যার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল – তিনিই আমার রবীন্দ্রনাথ হতেন। আমার মধ্যে আমার সাথে তিনিও বেড়ে উঠেছেন। আস্তে আস্তে তিনি আমার কাছে একটা মন্দির হয়ে উঠেছেন। আমি যদি না নাচতাম, তবেও হয়তো রবীন্দ্রনাথ এই একই ভাবে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথকে, আমি নাচের মধ্যে বার বার এড়িয়ে যেতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। আসলে রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে নেশা – তাঁর কাছে কোনো জোর খাটে না। আসলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করতে হলে নিজেকে শূন্য করে কাজ শুরু করতে হবে।

Published inFeature Writing

Comments are closed.

%d bloggers like this: