Skip to content

কলকাতার সেই গ্যাস ক্রিমেটোরিয়াম – সপ্তর্ষি রায়বর্ধন

বর্গীদের আক্রমণ প্রতিহত করবার তাগিদে ‘মারাঠা ডিচ’-এর খনন কার্য্য শুরু হল ১৭৪২ নাগাদ। চিৎপুরের গঙ্গার ধার থেকে চক্রাকারে বাঁক নিয়ে সে পৌঁছল দক্ষিণ পশ্চিমে পুরনো কেল্লার নীচে – বাদামতলার পাশ ঘেঁষে। বাদামতলা তখনও জল জঙ্গল ঘেরা – সাহেবদের মূল বসতি থেকে খুব দূরত্বে না হলেও – ওদিকে খুব একটা যাতায়াত নেই তাঁদের।
সিরাজদ্দৌলার কোলকাতা আক্রমণ আর লালদীঘির যুদ্ধ হোল চোদ্দ বছর বাদেই। ইংরেজদের সাময়িক পরাজয় স্বীকার সে যুদ্ধে। একবছর বাদেই পলাশীর যুদ্ধ এবং তারপরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয়যাত্রা এদেশে। অবশেষে ১৭৬৭-তে বাদামতলায় স্থাপিত হোল একটি সমাধিক্ষেত্র – লোকজনের যাতায়াত সুরু হোল ওদিকটায়; রাস্তার নাম বদলে হোল বারিয়াল গ্রাউন্ড রোড।
ওদিকে মারাঠা ডিচের কাজ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে পড়েছে। যতটা কাটা হয়েছিল দিনে দিনে অব্যবহারে সেটা হয়ে উঠেছে আস্তাকুঁড়। কোম্পানির হুকুমে খাল বুজিয়ে তৈরী হোল আপার ও লোয়ার সার্কুলার রোড। অবশেষে ১৮৪০-এ লোয়ার সার্কুলার রোডের পুবদিকে স্থাপিত হল আরেকটি সমাধিস্থান এবং বারিয়াল গ্রাউন্ড রোডের নাম আবার বদলে গেল – হোল পার্ক স্ট্রীট। ১৯০৪ সালে লোয়ার সার্কুলার রোডের এই সমাধিস্থানের পাশেই তৈরী হোল একটি নতুন রাস্তা – ক্রিমেটোরিয়াম স্ট্রীট। আর সেই রাস্তার ওপর কাজ সুরু হয় গ্যাস ক্রিমেটোরিয়ামের । মৃতদেহ দাহ করবার জন্য এরকম যান্ত্রিক পরিকল্পনা। সম্ভবত কোলকাতা এবং ভারতে প্রথম।
গোঁড়া হিন্দুদের কাছে এই যান্ত্রিক চুল্লী কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছিলো বলা মুশকিল – কিন্তু সাহেবদের কাছে শব দাহ করবার এই ব্যবস্থা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আসলে, সে সময়ের কোলকাতায় বহু লোকজন মারা যেতেন নানান সংক্রামক ব্যাধিতে; সাহেবরাও তার ব্যতিক্রম নন। অতএব শব দাহ করলে সেই রোগের জীবাণু খানিক প্রতিহত হতে পারে, আর দ্বিতীয়ত, মৃত সাহেব-সুবোদের মনস্কামনা পূরণের তাগিদ – প্রিয়জনের মৃতদেহ দেশের মাটিতে সমাহিত করা। জাহাজে চেপে শবদেহ বিলেত পৌঁছতে যা সময় লাগবে, তার চেয়ে এখানে দাহ করে সেই চিতাভস্ম ওদেশে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করাই শ্রেয় এবং মানবিক। আজকের সময়ে, মানে এই একাদশ শতাব্দীতে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘আর্ন বারিয়াল’ অর্থাৎ মৃতদেহ দাহ করে তার ভস্মাবশেষ একটি পাত্রে (urns) রেখে এবার সেই পাত্রটিকে মাটির নীচে সমাহিত করবার রীতি-রেওয়াজ চালু হয়েছে মূলতঃ স্থানাভাবের কারণে। অতএব সেদিক থেকে চিন্তা করলে – বিংশ শতকের গোড়ায় এই পরিকল্পনা যথেষ্ট প্রগতিশীল।
যাই হোক, অবশেষে ১৯০৬ সালে ফরাসী কোম্পানি Toisoul Fradet & Co.-র তৈরি করা নকশা অনুসারে গ্যাস চুল্লীর নির্মাণ কাজ শেষ হোল। খরচ পড়ল প্রায় ৩৪ হাজার টাকা। ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির রাজাবাজারস্থিত গ্যাস প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা গ্যাসের সাহায্যে প্রায় ১৮টি বুন্সেন বার্নার প্রজ্জলিত হতো চুল্লীর ভেতরে। তাপমাত্রা ১৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের কাছাকাছি।
শব দাহ করে সেই ভস্মাবশেষ একটি পাত্রে বন্দি করে সেটিকে সমাধিস্থ করতে খরচ পড়ত মোট ৬২ টাকা। গ্যাস চুল্লীর পাশের জমিতেই ছিল একটি ছোট কবরস্থান। সেখানেই তৈরি হতো এই সমাধিক্ষেত্র সাধারণত ২ x ২ ফুট মাপের ।
খ্রিস্টান ছাড়াও এখানে সময়ে সময়ে বৌদ্ধ ও পার্শিরাও শবদাহ করাতেন। আর আসতেন ব্রাহ্মরা এবং কোলকাতার ধনীক শ্রেণী যারা চাইতেন না গঙ্গা তীরবর্তী ঘাটে কাঠের চিতায় তাঁদের প্রিয়জনের শব দাহ করতে। প্রচণ্ড অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ছিল সেই সময় ঐ শ্মশানগুলোয়। দাহ করবার জন্য চুল্লীর ব্যবস্থা তো ছিলই না। উপরন্তু ধর্মবিশ্বাসের কারণে গঙ্গার জলে নিমজ্জিত হতো বহু মৃতদেহ – সঙ্গে ছিল অন্তর্জলী যাত্রা বা সতীদাহের মতো প্রথা; সব মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে এই গ্যাস ক্রিমেটেরিয়ামে দাহ করা হয়েছিল প্রফেসর প্রশান্ত মহলনাবীশ, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, বিজ্ঞানী এস এন বোস এই রকম বহু ব্যক্তিবর্গকে।
আজও দাঁড়িয়ে আছে এই গ্যাস চুল্লী কর্মব্যস্ত মল্লিকবাজার আর পার্ক সার্কাসের মাঝামাঝি এক জায়গায় – এক কোণে। প্রথম দর্শনে মনে হতেই পারে কোন গথিক ছাঁদে তৈরি এক গীর্জার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। জানালার কাঁচ ভেঙ্গে পড়েছে; গাছের মোটা শেকড় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে লাল ইটের দেওয়াল। ভেতরে পড়ে রয়েছে একশ বছরের পুরনো একটা লৌহ চুল্লী আর তার সামনে স্থির হয়ে আছে একটা চাকাওয়ালা শবযান – যা ব্যবহৃত হতো অন্তিমযাত্রার শেষে প্রাণহীন দেহটাকে আগুনের কোলে প্রতিস্থাপনের কাজে।
আজ সবাই প্রাণহীন।

প্রচ্ছদ: Tutorials Home

Published inFeature Writing

Comments are closed.

%d bloggers like this: