Skip to content

সহজ নয় – অন্তরা দত্ত

Last updated on August 24, 2019


ঝাড়গ্রাম থেকে কলকাতায় আসার পথে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছিল ঋজু । ফেব্রুয়ারী মাসের খামখেয়ালি নিম্নচাপ পথে বিঘ্ন ঘটাল বারবার । ট্রেন হাওড়ায় ঢুকল পাক্কা তিরিশ মিনিট লেটে । ভাগ্যিস হাতে সময় নিয়ে বেরিয়েছিল ; নইলে আজ অনন্যার কাছে প্রেস্টিজের বেলুন ফুটো হতোই ।

উদবেগে ছটফট করে কাটিয়েছে সারা পথ । যতই হোক আজ ওদের ফার্স্ট ডেট বলে কথা , অন্তত ঋজুর তরফ থেকে । বেশ কয়েকমাস whatsapp chatting এর পর অনন্যা ওর সাথে মিট করতে চেয়েছে । ঋজুও না বলতে পারেনি । যদিও অনন্যার মন এখনো বুঝে উঠতে পারেনি ও । তাই মিট করার আগ্রহটা আরও বেশি । যদি অনুর অন্তরের কোনো হদিস পাওয়া যায় ! আজকের আবহাওয়ার মতোই মনের অভ্যন্তরে মেঘ-রৌদ্রের টানাপোড়েন অনুভব করল ঋজু ।


ঋজু ও অনন্যা ইউনিভারসিটি ক্লাস মেট ছিল , যদিও সে সময়ে ওদের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল না । এমনিতেই অনন্যা ছিল বদমেজাজি , তেজের দাপটে বিশেষ কোনও ছেলে ওর কাছে ঘেঁষত না । সবসময়ে একটা ভুরু তোলা ভাব । আড়ালে আবডালে অনেকে ‘লেডি হিটলার’ বলতেও ছাড়ত না । তাতেও মেয়ের ডোন্ট কেয়ার মনোভাব । একবার তো ঋজুরই এক বন্ধুকে সাহিত্যের ইতিহাসের গাবদা বই ছুঁড়ে মেরেছিল । সে বেচারা ভগ্ন হৃদয় নিয়ে আর ও-মুখো হয়নি । ঋজুরাও সামলেই চলেছে চিরকাল ।

ইউনিভারসিটি ছাড়ার বেশ কয়েক বছর বাদ অনন্যাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় ঋজু । পুরনো বন্ধুদের নতুন করে ফিরে পাবার লোভেই এই যোগাযোগ । ভেবেছিলো কোনোরকম রিপ্লাই ও অনন্যার কাছ থেকে পাবেনা ; কিন্তু ঘটলো উল্টো ! অনন্যা বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বন্ধুত্ব গ্রহণ করল । মেয়েটা যে এতো ফ্র্যাঙ্ক , এতো দাউন টু আর্থ বোঝা যায়নি আগে । হতে পারে কালানুক্রমিক পরিবর্তন । কিন্তু তাও ! বেশ অবাকই হয়েছিল ও । ফেসবুক থেকে অনন্যার whatsapp এও ঢুকে পড়ল ঋজুর প্রোফাইল । জোর কদমে সংহতি স্থাপনের চেষ্টা আর কি !


দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ঋজুর বড় হয়ে ওঠা । এখন তো চাকরির সন্ধানে জুতোর সুকতলাও খুইয়েছে ; কিন্তু এই লড়াইয়ে ও পাশে পেয়েছে অনন্যাকে । অনন্যাও ওর প্রতিযোগিনী ; তাতে কি ! প্রতিমুহূর্তে ও ঋজুকে উৎসাহ যোগায় , ভেঙে না পড়ার কথা বলে । সবমিলিয়ে অনন্যার প্রতি একটা গভীর আবেগ যেন উঁকি দিয়ে যায় । মাঝে মাঝে তো ঋজুর মন বলে ওঠে –
“ হে মোর বন্যা , তুমি অনন্যা আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা ”

এক সপ্তাহ ধরে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে অনন্যা । ওর সঙ্গে নাকি দেখা করতেই হবে , খুব জরুরি কথা আছে । অগত্যা হুকুম মেনে হাজির হতেই হয় । ---- এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ও বই পাড়ায় চলে এলো । পরীক্ষা – নম্বর – আন্দোলন – প্রাপ্তি – অপ্রাপ্তি – আড্ডা – বই – চায়ের ঠেক – প্রেম – বিচছেদ --- সবকিছুর স্মৃতি একসাথে ভিড় করে এলো ঋজুর মনে । রোমাঞ্চ লাগলো । দীর্ঘ চার বছর পর অনন্যার সঙ্গে ওর দেখা হবে । কফি হাউসে আড্ডাটা জমবে ভালো । উত্তেজনায় টগবগিয়ে পা চালাল ঋজু । কিন্তু ঢুকেই একেবারে থ মেরে গেল ঋজু । অনন্যার সঙ্গে ও কে ? খোশমেজাজে গল্প করছে দুজনে । আজকে আর কোন বন্ধুর আসার কথা তো ছিল না । আচ্ছা গোল বাঁধল তো ! সব প্ল্যান মনে হচ্ছে চৌ পাট হল । উফফ ! ঋজুকে দেখেই অনন্যার সরল মুখ হাসিতে খলবলিয়ে উঠলো । হাত বাড়িয়ে ডেকে নিল ওকে । ফ্লরাল টপ ও দেনিম জিন্সে , উইদাউত মেক আপ লুকে অনন্যাকে ঠিক আগের মতই ঝলমলে লাগল । পাশে গিয়ে বসতেই তৃতীয় ব্যাক্তির মুখোমুখি হল ঋজু । বেশ intelligent ফেস ভদ্রলোকের । অনন্যাই পরিচয় করিয়ে দিলো --- “ইনি ডঃ অদম্য দে । শহরের একজন নামকরা cardiologist । তোর সঙ্গে পরিচয় করাতে নিয়ে এলাম । আমার জীবনের একজন ভীষণ ইম্পরট্যান্ট মানুষ ।“

নমস্কার-প্রতিনমস্কারের পর্ব চুকতেই হার্ট ব্রেকিং নিউজটা দিলো অনন্যা । ওর ফ্যান্সি ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এলো বিয়ের কার্ড ।
“নেক্সট মান্থ এই বিয়ে । তোকে কিন্তু আসতেই হবে ঋজু ।“
কথার লেজ ধরলেন ডাক্তারবাবুও —
“ অনন্যার মুখে তোমার নাম এতো শুনেছি যে আমি নিজেই চলে এলাম তোমায় invite করতে । এসো কিন্তু ।“


ঋজু যেন বাক শূন্য হয়ে গেছে । মাথাটা জোরে কোথাও ধাক্কা খেলে যেমন চারদিকে শূন্যতা তৈরি হয় , তেমনি যেন দশা । এতটা দূর থেকে ওকে কলকাতায় টেনে আনার পিছনে তাহলে অনন্যার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না ! এতো রহস্যেরই বা কি দরকার ছিল ! অকস্মাৎ সাহারা হয়ে যাওয়া হৃদয়ে ঋজু ওদের দুজনকে অভিনন্দনটাও জানাতে ভুলে গেল । চট করে একদিনের whatsapp chatting এর screenshot ভেসে উঠলো স্মৃতিপটে ।
ঋজু বলেছিল —“ অনন্যা , বিয়ে করে নে । চাকরি আর আমাদের কপালে নেই , বুঝলি ।“
“ বলছিস ? দেখি ভেবে… “ অনন্যা রিপ্লাই দিয়েছিল ।
“ এখনো খুঁজলে ডাক্তার , প্রফেসর পেয়ে যাবি । নইলে সব আমাদের মতো আড়াই হাজারি ইন্টার্ন বন্ধু ! “( সঙ্গে একটা চোখ মেরে জিভ বের করা ইমোজি )
ওর এই কথাগুলোকে এতো তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত করে ফেলবে অনন্যা , ভাবেনি ঋজু ।
কিন্তু এ কি ! অনন্যা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে কেন ? কতক্ষণ এভাবে চেয়ে আছে কে জানে ! ঋজুর স্মৃতির ফল্গু ধরে ফেলল নাকি ও ! বিশ্বাস নেই মেয়েটাকে ।
অবিলম্বে মুখে হাসি ফুটিয়ে আলাপ জমাতে চেষ্টা করল ঋজু । তবে মিনিট দশেক বাদেই ব্যস্ত ডাক্তার চেম্বার আছে বলে বিদায় নিলেন ।
এরপর শুরু হল ঋজু আর অনন্যার আড্ডা । ঋজু বেশির ভাগটাই নির্বাক হয়ে রয়ে গেল । কল্কলিয়ে গেল শুধু অনন্যাই । তবে আড্ডার মাঝেই ও লক্ষ্য করল অনন্যার অনুসন্ধানী চোখ ওর মুখের ওপর কিছু যেন খুঁজে চলেছে প্রতি ক্ষণে । অস্বস্তি হতে লাগল ওর । টেবিল ছেড়ে বিল মেটাতে উঠে গেল ঋজু । কফি হাউস থেকে বেরোবার সময়ে একটা চিরকুট ঋজুর হাতে ধরিয়ে দিলো অনন্যা । কৌতূহলী হয়ে দেখতে গেলে অনন্যা উপদেশের সুরে বলল —
“পরেই না হয় দেখিস । তোর জীবনে কাজে লাগবে ।“ বলেই মুখটা কেমন কৌতুক মিশ্রিত গাম্ভীর্যে পূর্ণ করে তুলল ।
ব্যাপারটা বেশ রহস্যময় লাগল ঋজুর । আজব মেয়ে তো । এসব চিরকুটের কী মানে ? মুখটা থম্থমে করে কলেজ স্ট্রিটে কিছু কাজ সারার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়াল । পাঁচন খাওয়ার মতো মুখ করে ট্রেনে উঠে বসল । ট্রেন ছাড়ার পর এক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুককে পয়সা দেবে বলে পকেটে হাত দিতেই চিরকুটটা নিজের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিলো । সত্যি তো , ওই কাগজটার কথা তো মনে ছিল না ।
লাল রঙের কাগজটা খুলতেই দুটো বিখ্যাত লাইন চোখের সামনে বলে উঠল —
“ হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয় ।“
এ কী ধরনের রসিকতা ! ও কি আমাকে কোনোভাবে ব্যঙ্গ করার চেষ্টা করল ? ভাবল ঋজু । হয়ত অনন্যা আমার দুর্বল জায়গাটা ধরে ফেলেছিল , তাই ডেকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিলো । ঠিকই করেছে ! ঋজুই বাস্তব না বুঝে বেশি আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েছিল ।
অনন্যাকে বিয়ের অভিনন্দনটা জানিয়ে আসা হয়নি , মনে পড়ে গেল ঋজুর । ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করবে বলে হাত ঢোকাতেই বিয়ের কার্ডটা হাতে ঠেকল । ক্লান্ত চিত্তে সেটা খুলে চোখের উপর ধরল ও । পর মুহূর্তেই যেন চমকের দাপটে শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে উঠল ঋজুর । কার্ডে কনের নামের জায়গায় অনন্যার নাম তো নেই ! উল্টে অদম্য দে -র পরিবার পরিচিতিতে বোন হিসাবে অনন্যা দে -র নাম জ্বলজ্বল করছে । তার মানে ?!
হতভম্ব মুখ নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবার পর ঝটপট মোবাইল ফোনের ডেটা অন করতেই whatsapp এ অনন্যার মেসেজ ঢুকতে শুরু করল ।
“ কি রে বুদ্ধু … খুব ঘোল খেয়েছিস মনে হচ্ছে …
খণ্ড -ত এর মতো মুখ দেখেই বুঝেছি …
তোর পেটের ভিতর গিজগিজ করা প্রশ্নগুলোকে ঘুষি মেরে বের করতে ইচ্ছা করছিল ।
তবে আমি তোর ওই রি-এয়াকশন হেভি এঞ্জয় করেছি বস … ( সঙ্গে হাসতে হাসতে চোখে জল আসার
ইমোজি )
আর শোন , দাদার গিফট এর সঙ্গে আমার জন্যেও একটা আনিস … তোকে বুদ্ধু বানানোর গিফট “ ( সঙ্গে হাসতে হাসতে চোখ বুজে যাবার ইমোজি )

মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে ঋজুও ফিক করে হেসে ফেলল । সত্যিই এই বুদ্ধি আর সন্দেহে গড়া হৃদয় নিয়ে ওর অনুর সঙ্গে এঁটে ওঠা সহজ নয় ।

Published inStory

Comments are closed.

%d bloggers like this: