Skip to content

নাম দিলাম রবীন্দ্রনাথ – মধুবনী চট্টোপাধ্যায়

Last updated on May 9, 2019

চলার পথটির নাম দিয়েছি রবীন্দ্রনাথ ! শৈশবের ভোর ছুঁয়ে , কৈশোরের আলো মেখে যৌবনের মধ্যগগনে , যেখানটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি আজ , সেই ঝিরঝিরে , আলো ছায়ার ইতিউতি খেলার নাম দিয়েছি রবীন্দ্রনাথ । ফেলে আসা স্মৃতি বিস্মৃতির যে পথটি বারবার আমায় অতীতের ঠিকানায় নিয়ে যায় , যেখানে শহুরে দক্ষিণ আর উত্তর তাদের নিজেদের গল্প লিখেছে ধুলো মাখা কলকাতার আনাচে কানাচে , সেই যে প্রথম লেকের জলে পূর্ণিমা দেখা বনজ্যোৎস্না গায়ে মেখে , সেই যে বাড়ির রাস্তায় ঢোকার মুখে বিশাল কাঠচাঁপার গা থেকে চুঁইয়ে পড়া মন কেমনে গন্ধ , গোধূলির আলোয় উদাস হওয়া শূন্যদৃষ্টি , উত্তরের নোনাধরা পাঁচিলে সবুজ শ্যাওলার মখমলে সোহাগ , কাঁসা পিতলের গন্ধ , ঘষে যাওয়া সিঁদুরের টিপ , আঁচলে চাবির গোছা , খড়খড়ি দেওয়া জানলার ওপারে তোরঙ্গ থেকে বের করে আনা দোমড়ানো মোচড়ানো পুরোনো কাঁথার গন্ধ গায় আমার শহর….তার নামও রবীন্দ্রনাথ ।
পিচ গলানো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মেঘদূতের প্রথম শ্লোক টির সঙ্গে পথের বাঁকে হঠাৎ দেখা ! এক নিমেষে সেই কালো পথ হয়ে গেলো আদিগন্ত সবুজ গালিচা যার ওপর ঝুঁকে পড়ে বিরহী যক্ষ মেঘ কুড়িয়ে বেড়ায় তার প্রিয়ার উদ্যেশ্যে ভাসিয়ে দেবে বোলে ….! এই যক্ষের নামও রবীন্দ্রনাথ ! শরতের শিশির ভেজা ভৈরবী, হেমন্তের গাঢ় আলিঙ্গন , শীতের নিঃস্বতা আর বসন্তের উন্মাদনার নামও রবীন্দ্রনাথ ।
যে ভালোবাসার পথ বকুলকুঞ্জ , শালবীথি ছুঁয়ে আম্রকুঞ্জের গা ঘেঁষে, লালমাটির আভা মাখা রেশম কোমল বেনারসী চেলীতে সাজিয়ে সানাইয়ের সুরে আলোর রোশনাই জ্বেলে নতুনকে বরণ করালো , তার নাম রবীন্দ্রনাথ । আবার কোনো এক বসন্তের দিনে পলাশ ঝরা পথ দিয়ে যে ব্যথা জীর্ণ পুরাতনকে তার আপন ঘরে ফেরালো , তার নামও রবীন্দ্রনাথ ।
নাচের প্রতিটি ছন্দ , মুদ্রা , ভঙ্গির আনন্দ বেদনা যাঁর কাছে ঋণী , তিনি রবীন্দ্রনাথ । তুলির রেখা , কলমের আঁচড় , গানের সুর এমন কি এমব্রয়ডারির ওই ফুলের বাহার যাঁর পায়ে নিজেকে মিলিয়ে দিতে মাথা কোটে , তিনিও রবীন্দ্রনাথ । শাড়ির নক্সা পাড় , বাগান খোঁপায় রূপোর কাঁটা , হাতের গোলাপ বালা , সোনার মাপচেন , রবীন্দ্রনাথ ! ঘরে লাগানো বিশাল আয়নাটি , যেখানে দিনের শেষে নিজের সামনে এসে কাল অবধি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি , সেই আয়নাটিও রবীন্দ্রনাথ !
আমার ঘরে আলাদা করে রবীন্দ্রনাথের কোনো ছবি রাখিনি আমি । আমার কাছে তাঁর শত সহস্র অবয়ব , যা ওই একটি ফ্রেমে ধরা যাবে না ।
এইতো কালই পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখলাম কালো রাস্তার বুকের হলুদ রাধাচূড়ার গাছ তার পাপড়ি বিছিয়ে কালোয় আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে ! তার গায়ে অস্তগামী রবি সোনার বরণ রং ধরিয়েছে ! নিজের অজান্তেই অস্ফুটে তার নাম দিলাম রবীন্দ্রনাথ !
চিত্র ঋণ: শৌর্য মুখার্জি
Published inFeature Writing

Be First to Comment

Leave a Reply

%d bloggers like this: